April 19, 2018

বাগানের ভূত, ভূতের বাগান



মা বলেন, সোনা তোর সঙ্গে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। 

আমারও ইচ্ছে করে মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যেতে। মা যাওয়ার জায়গা ঠিক করবেন, ট্রেনবাস থাকার জায়গা বুক করবেন, বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে অসামান্য হিন্দিতে ড্রাইভারজিকে রাস্তা বোঝাবেন, রাস্তাঘাটে আলাপ জমাবেন, কেউ ত্যাঁদড়ামো করলে তাকে সিধে করবেন। আমি হাতপা এলিয়ে বসে থাকব। মায়ের সঙ্গে আমার বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছেতে কোনও রহস্য নেই। কিন্তু মায়ের আমার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছেটা বেদম রহস্যজনক। মা একবার আমাকে পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। হোটেল বুক করে, গাড়ির ব্যবস্থা করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে তুলে রওনা দিয়েছিলেন। এগারোটা নাগাদ হোটেলে পৌঁছে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে স্নানে ঢোকার আগে একটাই দায়িত্ব মা দিয়েছিলেন আমায়, রান্নাঘরে ফোন করে দুপুরের খাওয়ার অর্ডার দেওয়া। আমি কী করেছিলাম ভগবানই জানেন, মোটকথা রান্নাঘরের লোকদের বোঝাতে পারিনি যে আমরা খেতে আসছি। ঘণ্টাখানেক বাদে আমাকে সঙ্গে নিয়ে মা যখন খাবার ঘরে গেলেন আমাদের দেখে ওঁরা অবাক হলেন তারপর সামলে নিয়ে রুটি ডাল মিক্সড ভেজ এনে দিলেন। বললেন, পরের বার যদি একটু খবর দিয়ে খেতে আসেন ম্যাডামজি, তা হলে আরেকটু ভালো খেতে দিতে পারি।

আমার বয়স তখন সাতাশ। 

আমি ডুয়ার্স যাইনি, ডুয়ার্স যাওয়া যায়। মূর্তি নদীর পাশের গেস্ট হাউসের বারান্দায় বসে দিগন্তের জঙ্গলরেখার দিকে তাকিয়ে পা দোলানো যায়। মা ল্যান্ডোর দেখেননি, ল্যান্ডোরের ছায়াছায়া পথ ধরে মামেয়ে হাঁটা যায়। সিকিম আমরা কেউই যাইনি, যাওয়া যায়। রাবাংলা, গুরুডংমার ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর অনুস্বরযুক্ত নামওয়ালা জায়গায় ঘোরা যায়। আবার দুজনেরই চেনা জায়গায় ফিরে যাওয়া যায়, ধুবড়ির ব্রহ্মপুত্রের পারে বসে পুরোনো দিনের মতো বাদামভাজা খাওয়া যায়।  

এই সব সম্ভাবনা নাড়াচাড়া হচ্ছে, মা বললেন খবরের কাগজে না ম্যাগাজিনে কলকাতার ভূতের বাড়ির একটা লিস্ট দেখেছেন সম্প্রতি। কোন বাড়ির বারান্দায় এখনও বর্ষার রাতে সাহেব ভূত বুট পরে হাঁটে, রেডিওর পুরোনো অফিসে মাঝরাতে প্যাঁ প্যাঁ হারমোনিয়াম বাজে। লিস্টটা মা কেটে রেখেছেন। মায়ের ইচ্ছে বুঝে বললাম, লিস্ট ধরে ধরে সব বাড়িগুলো দেখতে গেলে মজা হবে, তাই না মা? মা বললেন, আমি তো সেই ভেবেই জমিয়ে রাখলাম। যদি কোনওদিন সুযোগ হয়… 

আপাতত স্থির হয়েছে যদি কোনওদিন সুযোগ হয়, মায়ের হাতের কাছে আমি থাকি, আমার হাতের কাছে মা থাকেন, দুজনেরই হাতে সময় থাকে, শরীরমন চাঙ্গা থাকে, শীতগ্রীষ্ম মাপমতো থাকে তা হলে আমরা লিস্টটা নিয়ে গুটি গুটি শহর পরিভ্রমণে বেরোব। দিনাদিনিই যাওয়া ভালো, বাড়ির মালিকদের সঙ্গে দেখা হওয়ার চান্স কম থাকবে।

*****

আমি কোনওদিন ভূত দেখিনি। অনেকবার মনে হয়েছে ঘাড়ের ঠিক পেছনে কে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, রাতে একা শুয়ে মনে হয়েছে ঘাড় ফেরালেই দেখব জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে কে হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু ঘাড় যেহেতু ফেরাইনি ভূতের সঙ্গে দেখাও হয়নি। দূরসম্পর্কের এক দিদা ছিলেন, আমাকে খুব ভালোবাসতেন, বাড়িতে গেলেই পাটিসাপটা খাওয়াতেন। আচমকা একদিন, কোনও কারণ ছাড়াই, এমন নয় যে সারাদিন দিদার কথা ভেবেছি কিংবা আমার সামনে বসে আমাকে না দিয়ে কেউ পাটিসাপটা খেয়েছে, সম্পূর্ণ আলটপকা দিদাকে স্বপ্ন দেখলাম। পরদিন মা খবর দিলেন, দিদা মারা গেছেন। জানুয়ারি মাসের রাতে হোস্টেলের হিটারহীন রুমে ঘাম ছুটে গিয়েছিল। মারা যাওয়ার সময় জানতে চাইলাম। মা বললেন, এই তো আজ সকাল দশটার সময়। সকাল দশটার সময় আমি দিদার স্বপ্ন দেখে উঠে ক্লাসে গিয়ে সাইমালটেনিয়াস ইকুয়েশন পড়ছিলাম। অর্থাৎ দিদা আমাকে দেখা দিতে এসেছিলেন ভূত হওয়ার আগেই। টাটা বলতে সম্ভবত। 

মাও কোনওদিন ভূত দেখেননি। আমার থেকে আঠাশ বছর বেশি পৃথিবীতে চলাফেরা করা সত্ত্বেও। ছোটবেলায় খেয়ে উঠে যে সব ভাইবোনদের আগে হাত ধোয়া হয়ে যেত, তারা বাকিদের উদ্দেশে ‘তিন কালা ভূত টিক্কি ধইরা টান দিল রে এ এ এ’ বলে হ্যারিকেনের আলোছায়ামাখা কুয়োতলা পেরিয়ে ধুপধাপ দৌড়ত, সে হুল্লোড়ে যোগ দেবার লোভেও কোনও কচিকাঁচা ভূত আসেনি কোনওদিন। 

ধরে নেওয়া যায় বাবাও কোনওদিন ভূত দেখেননি, দেখলে গল্প শুনতাম নিশ্চয়।

বাড়িতে ভূত দেখেছিলেন একমাত্র ঠাকুমা। ভরদুপুরবেলা, মাখনদাদুর বাগানে। ঠাকুমা বলতেন মাখমবাবু। মাখনদাদুর বাড়িতে মাখনদাদু, মাখনদাদুর স্ত্রী আর মিঠু নামের সবুজ টিয়া থাকত। ওই রকম নার্সিসিস্ট টিয়া আমি আর দেখিনি। সারাদিন দাঁড়ে বসে সে নিজের নাম ধরে চেঁচাত। মিঠুউউউউ, মিঠুউউউউ, মিঠুউউউউ। নিজের দাদু মারা যাওয়ার পরপরই আমি অমর চিত্র কথায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী পড়ি এবং মাখনদাদুর সঙ্গে ঠাকুমার বিয়ের ব্যাপারটা বাড়ির লোককে ভেবে দেখতে বলি। মানানসই বয়সটা একটা কারণ, তাছাড়া বিয়ের পর ঠাকুমা একেবারে পাশের বাড়িতেই থাকবেন সেটাও সুবিধেজনক। 

মাখনদাদুদের ছিল পাঁচিলঘেরা বিরাট বাগান। কাঠাবিঘের মাপ বলতে পারব না কিন্তু দুখানা বোম্বাই সাইজের দোতলা বাড়ি মাখনদাদুর বাগানে হেসেখেলে এঁটে গেছে। সে বাগানে আমার চেনা প্রায় সবরকম ফলের গাছ ছিল। আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা নারকেল সুপুরি, আরও কত নাম ভুলে যাচ্ছি। ওই বাগানেই প্যাঁচা দেখেছিলাম আমি প্রথম। প্রথম শকুন দেখেছিলাম। সুপুরিগাছের মাথায় কুঁজো পিঠ আর সরু ঠোঁট নিয়ে বসে এদিকওদিক তাকাচ্ছিল।

তিনজনের মধ্যে প্রথম মারা গিয়েছিলেন মাখনদাদুর স্ত্রী। পরের গরমের শুরুতে, আমগাছে সবে মুকুল ধরেছে, দুপুরবেলা পুজো করার আগে বাগানের কল থেকে জল ভরতে না কী করতে গিয়ে ঠাকুমা দেখেছিলেন বাগানে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। ঘাড় উঁচু করে আমগাছের মুকুলভরা ডালের দিকে তাকিয়ে।

ঠাকুমার হাতের কাঁসার ঘটি স্টেডি ছিল। ঘরে ঢুকে পাপোশে পা ঘষতে ঘষতে ঠাকুমা খবরটা দিয়েছিলেন। ভয় যে ঠাকুমা পাবেন না সে জানতাম, কিন্তু ঠাকুমা একবিন্দু অবাকও হননি। মরে গেলেই যে মানুষের মায়া ফুরোয় না, সে যে আমের মুকুল পাহারা দিতে ফিরে আসতে পারে সেটা যেন পৃথিবীর সবথেকে সহজসরল যুক্তির কথা।

মাখনদাদু আর মিঠুর মধ্যে কে আগে গেল সেটা অনেক ভেবেও মনে করতে পারছি না। মিঠু কীভাবে গেল, উড়ে না মরে, সেটাও না। মাখনদাদুর যাওয়াটা তবু খানিকটা স্মৃতিতে আছে, কারণ শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেতে গেছিলাম। বাগানের ধারে প্যান্ডেল বেঁধে পংক্তিভোজন হয়েছিল। 

শ্রাদ্ধের পরদিন সকালবেলা দাদুর ছেলে এবং মেয়ে, যারা নিজের নিজের সংসার ছেড়ে পিতৃদায় পালনে এসেছিল, ছাদ ফাটিয়ে পাড়া বাজিয়ে ঝগড়া করেছিল। মাসছয়েকের মধ্যে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল মাখনদাদুর বাড়ি, বাগান। 

বাড়িটা এখনও আছে। নতুন মালিকেরা বেশি অদলবদল করেননি। বাগান নেই। সেখানে এখন দুখানা প্রকাণ্ড বাড়ি। নতুন স্টাইলের এফিশিয়েন্ট ডিজাইনের বাড়ি। জমির সবটুকু বর্গইঞ্চি নিংড়ে তৈরি, পাঁচিল আর বাড়ির দেওয়ালের মধ্যে দু’পা পাশাপাশি রাখা যায় কি যায় না। তাতেও জায়গা কম পড়ে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে দোতলার ওপর তিনতলা তুলতে হয়। গাছটাছ ফুলটুল যা থাকার থাকে ছাদের টবে। ও সব বাড়িতে অনেক ধনসম্পদও থাকে তাই চোর তাড়াতে চারদিকে বড় বড় ফ্লুরোসেন্ট লাইট লাগাতে হয়। আমাদের ছাদের উত্তরদিকটা এখন সারারাত সাদা সি এফ এল আলোয় ফ্যাটফ্যাট করে। উত্তরের ওই অংশটুকুই ছিল আমাদের ফেভারিট, ওইখানে মাদুর পেতে শুলে এদিকওদিক থেকে গাছের ডাল বেরিয়ে আকাশ ফুটিফাটা করে দিত না। এদিকে কালপুরুষ ওদিকে সপ্তর্ষি স্পষ্ট দেখা যেত। এখন ওদিকে শুলে সারা শরীরে আলো, আকাশ অস্পষ্ট।

বাড়ি গেলে আর ছাদে উঠলে আজকাল দক্ষিণপূর্বের অন্ধকার ফালিটুকুতে নিজেকে কোনওরকমে ঢাকা দিয়ে আমি মাখনদাদুর বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকি। কল্পনা করি, আলো নিভে গেছে। অন্ধকারে মাথা তুলেছে বৃক্ষের দল। ডালপালা মেলেছে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে জমেছে ঘন ঠাণ্ডা ছায়া। গাছের ডালে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে ধপধপে লক্ষ্মীপেঁচা। সুপুরিগাছের ওপর আবের মতো ফুলে রয়েছে অন্ধকার, অন্ধকার না, ডানা গুটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে শকুনের দল। বাগানের দিক থেকে আসছে মুকুলের আঠালো সুবাস, সে গন্ধে ঝিম ধরে ধরে, অমনি হৃৎপিণ্ড বন্ধ করে দিয়ে সরু গলায় কে যেন চেঁচিয়ে ওঠে, মিঠুউউউউ মিঠুউউউউ মিঠুউউউউ।

এত করে চাই, তবু মাখনদাদুর বাগানের ভূতেরা আমাকে দেখা দেয় না।


April 17, 2018

অযৌক্তিক



রবিবার আমার মনখারাপ হয়েছিল। হাতপা অবশ, ঘাড় টনটন, চোয়াল শক্ত, বুকের ভেতর ফাঁকা, হোঁচট খাওয়া নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস। ঘাড়ের ওপর একটার জায়গায় দশটা মুণ্ডু, দশরকম তীব্রতায় দপদপ করছিল। মাঝখানের মেন মুণ্ডুটার ফাঁকা হলঘরে গ্যাঁট হয়ে বসে ছিল একটা যন্ত্র, দোমড়ানো তোবড়ানো ধাতব শরীর, চোখ নাক কান হাত পা নেই, মুখের জায়গায় একটা প্রকাণ্ড গর্ত। গর্তের ভেতর কুটকুটে অন্ধকার। অন্ধকার থেকে বেরোনো খোনা গলা গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলছিল, 'হল না। হবে না। পেলাম না। সবাই পেল। হেরে গেলাম। কী লাভ। এত লোক থাকতে আমিই কেন।' 

চোখ বুজে শুয়েছিলাম আর প্রার্থনা করছিলাম হয় আমার চারপাশটা অদৃশ্য হয়ে যাক, নয় আমি অদৃশ্য হয়ে যাই। পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাক, নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে ছিরকুটে পড়ে থাক, আমি নেচে নেচে তার রক্তপান করি। কেজি ক্লাস থেকে যত লোকের ওপর যত রাগ হয়েছে সব তিনগুণ হয়ে ফেরৎ আসছিল। কাকে হাতের কাছে পেলে কী উচিত জবাব দিতাম মাথার ভেতর ক্রমাগত প্র্যাকটিস করছিলাম। তাবৎ দুনিয়াটাকে হাড়ে হাড়ে শিক্ষা দেওয়ার মতলব ভাঁজছিলাম দমবন্ধ করে। আর নরকের আগুনে ভাজাভাজা হচ্ছিলাম।

নিয়মিত ইন্টারভ্যালে এ রকম দিনরাত যে আসবে সেটা আমি মেনে নিয়েছি। চলেও যাবে। ঘণ্টা বারো দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দিতে পারলেই। এর থেকে কমেও নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে, তবে সে জন্য বাড়ি থেকে বেরোনো মাস্ট। এইজন্য সপ্তাহের মাঝখানে এই সব মনখারাপের অ্যাটাক হওয়া সেফ। কারণ অফিস যেতেই হবে। অফিস না গেলে চাকরি যাবে। চাকরি গেলে আর নরকটা টেম্পোরারি থাকবে না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গাড়বে মাথার ভেতর। সপ্তাহের মাঝখানে মনখারাপ হলে আমি তাই মনকে ত্যাগ দিয়ে শরীরের ওপর মনোযোগ দিই। সেটাকে স্নান করিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে, জামা পরিয়ে, জুতো গলিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নামাই। আর নামামাত্র ঘরের ভেতর বসে বসে যে দুনিয়াটাকে অভিসম্পাত দিচ্ছিলাম, রোদ, ধুলো, গরম, হর্ন, কুড়া কুড়োনোর গাড়ির টোকো গন্ধ নিয়ে সেটা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

তাতেই প্রতিরোধ খানিকটা ঢিলে হয়। তারপর কপাল ভালো থাকলে হাস্যমুখ তরুণ কিংবা বৃদ্ধ সর্দারজী চালকের সিট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, ‘গুড মর্নিং, ম্যাডাম।’ 

তখন কীই বা করার থাকে? চেঁচিয়ে বলা, ‘চুলোয় যান আপনি আর আপনার মর্নিং। গুড না হাতি। বিশ্রী, অকথ্য, জঘন্য, যত্তসব…’? 

অফ কোর্স, বলব না। বলব, ‘গুড মর্নিং।’ কাষ্ঠহাসি হাসতেও হবে। হাসতে গিয়ে ঠোঁট সামান্য ফাঁক হবে। অমনি সে ফাঁক দিয়ে হু হু করে রিয়েল লাইফ ঢুকে পড়বে। দৌড়োদৌড়ি করে দখল নেবে শরীরের। শিরাধমনীর রেলিং-এ স্লিপ খেয়ে হুস করে পৌঁছে যাবে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ। হুড়মুড়িয়ে দরজা ভেঙে ঢুকবে মুণ্ডুর হলে। চৌকো যন্ত্র তখন সবে দম নিয়ে আরেক সেট হাহাকার ওগরানোর জন্য রেডি হচ্ছে। দুপক্ষই দুপক্ষকে দেখে চমকে যাবে। থমকে যাবে।  

প্রথমে সামলে নেবে রিয়েল লাইফ। চোখ কপালে তুলে, কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে জানতে চাইবে, ‘এটা কী রে?’ 

খুব ভয়ংকর জিনিসরা আসলে খুব হাস্যকরও হয়। ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যানের ইউনিফর্মটার কথা ভাবুন। আমার মুণ্ডুর ভেতরের যন্ত্রটা ওইরকম রক্তজমানো আর্তনাদ ছাড়তে পারে বটে, কিন্তু চেহারা খোলতাই। ভুষিরঙের খসখসে তোবড়ানো গা, দন্তহীন মুখগহ্বর। 

রিয়েল লাইফের হাসি দেখে যন্ত্রের কনফিডেন্সে টান পড়বে। আস্তে করে মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়।

সেদিন এসব হওয়ার চান্স ছিল না। একে রবিবার তার ওপর নববর্ষ। চ্যানেলে চ্যানেলে সুন্দর দেখতে লোকজন সুন্দর জামা পরে বসে নিজেদের সাফল্য উদযাপন করছেন। তাঁদের হাসি আমার কানে হাতুড়ি পিটতে লাগল। টিভি বন্ধ করলাম। মুক্তি নেই। পাড়ায় কে তারস্বরে তা তা থৈ থৈ চালিয়ে রেখেছে। বাঙালি পাড়ায় যেনতেনপ্রকারেণ লেপটে থাকার মজা বুঝলাম হাড়ে হাড়ে। 

বিকেল নাগাদ যন্ত্রের চার্জ কমে এল, হাহাকার নিভে এল। দেহটা টেনে তুললাম বিছানা থেকে। চা করলাম। খেলাম। হাতপায়ে তখনও জোর নেই, বুক তখনও অল্পঅল্প ধড়ফড় করছে। কিন্তু নিজেকে আবার সোজা করে তোলা দরকার। আজকের দিনটা কৃষ্ণগহ্বরে বিলীন হয়েছে, কালটাও যাতে না মাটি হয় সেটার একটা চেষ্টা করা দরকার। নীল ডাইরি খুলে নতুন পাতায় নতুন সপ্তাহের টু ডু লিস্ট লিখতে যাব…

একটা উপলব্ধি হল। 

সকাল থেকে ফুরিয়ে গেল, ফসকে গেল-র চক্রব্যূহে ঘুরছিলাম বলেই বোধহয় আমার কোনও সন্দেহ ছিল না যে এপ্রিল মাসটাও শিগগিরই ফুরোতে বসেছে। এ সপ্তাহে না হলেও, সামনের সপ্তাহে তো ফুরোচ্ছেই।

ভুল জানতাম। এপ্রিল মাস ফুরোচ্ছে আরও গোটা একটা সপ্তাহ বাদে।

ডায়রির ভাঁজ থেকে একটা এক্সট্রা সপ্তাহ কোলের ওপর খসে পড়ল। যেন প্যান্টের পকেট থেকে বেরোলো ভুলে যাওয়া পাঁচশো টাকার নোট। 

ধড়ফড়ানি থেমে গেল, হাতপা স্টেডি হয়ে গেল। ন’টা খসে গিয়ে একটাই মুণ্ডু পড়ে রইল, ধড়ের সঙ্গে টাইট করে আটকানো। ভেতরে উৎসাহ, উদ্দীপনা, পড়ে পাওয়া সপ্তাহটার সদ্ব্যবহারের অযুত সম্ভাবনা গজগজ করছে।

একটু টিভি দেখা যাক। প্রস্তাব দিলাম অর্চিষ্মানকে। দেখবি তো দেখ তক্ষুনি জি বাংলায় নববর্ষের আড্ডা বসেছে, অঞ্জন দত্ত, নীল দত্ত, আবীর, সৃজিত, অনুপম… ভলিউমটলিউম বাড়িয়ে গুছিয়ে বসলাম। মাঝখানে একবার সম্প্রচারের গোলযোগে পর্দা ঝিরিঝিরি হচ্ছিল, বাংলা সংস্কৃতির এই রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ জমায়েতে এইরকম বিঘ্ন কেবল বাংলাদেশেই ঘটতে পারে, রেগে গিয়ে আলোচনা করলাম আমরা।

সারাদিন যে ব্যর্থ, বীভৎস, অনর্থক জীবনটাকে অভিশাপ দিচ্ছিলাম, সেটা সাতদিন দীর্ঘায়িত হওয়াতে শুধু যে মনখারাপ কেটেই গেল তা নয়, নব আনন্দে সর্বাঙ্গ চনমন করে উঠল। কী করে, ভগবানই জানেন।



April 15, 2018

শুভ নববর্ষ



নববর্ষের পোস্ট লিখতে বসে টের পেলাম বর্ষটাই জানি না। গুগল করলাম, কিন্তু সেই যে বাধা পড়ল আর ঠিক হল না। একের পর এক খারাপ খবর আসতে লাগল। 

ভেবে দেখলাম, যা যা নিয়ে নববর্ষের পোস্ট লেখা যেতে পারত সেগুলোর কোনওটাই আর নেই। হালখাতা নেই। ন্যাতানো নিমকি নেই। দু’টাকা পিস দানাদার নেই। ক্যালেন্ডারে মা কালীর পায়ের কাছে জবাফুলের পাপড়িতে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মা সারদার মুখ নেই।

নতুন জামা নেই। যে রকম জামা পরার আগে স্রেফ চোখে দেখেই গরম লাগা কমে যায়, সে রকম জামা নেই। কারণ মা হাতের কাছে নেই। থাকলেও সুবিধে করতে পারতেন না কারণ এ বাড়িতে ঊষা কোম্পানির সেলাই মেশিন নেই। সর্বাঙ্গে নাইসিল ছড়িয়ে সেই জামা পরে যে পাড়া বেড়াতে বেরোব সে নাইসিল নেই।

একটা ভদ্রস্থ কালবৈশাখী নেই। নারকেল গাছ নেই যে সে গাছের মাথায় ঝড় দেখব।

একটা ছাদ নেই যে বৃষ্টি থামার পর ছাদে উঠে ভেজা ছাদে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠাণ্ডা হাওয়া খাব।

পাড়ায় পাড়ায় বর্ষবরণ নেই। ন্যাড়া মাথায় ফুলের মালা জড়িয়ে ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে’ নেই। ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত মাঠের কাদায় পা ডুবিয়ে ছাতামাথায় উৎসাহ দিতে আসা বাবা মা ঠাকুমা দাদু মামা মাসি কাকা পিসি নেই। 

তুলসীতলার নরম মাটিতে বাঁশের কঞ্চির মিনি ভারা নেই। ভারা থেকে ঝুলন্ত মাটির কলসির ফুটো দিয়ে সারা বৈশাখ তুলসীগাছের ওপর পড়তে থাকা জলের ফোঁটা নেই। কারণ অত কাণ্ড করার জন্য ঠাকুমা নেই।

পরিশীলিত উচ্চারণ এবং ততোধিক পরিশীলিত দাড়ি নিয়ে পঙ্কজ সাহার নববর্ষের সকালে একচ্ছত্র আধিপত্য নেই।

এন সি আরের লক্ষকোটি সিনেমা হলে এই মুহূর্তে একটাও বাংলা সিনেমা নেই। 

রেগে গিয়ে টিভি চালালাম। সংগীত বাংলায় একটা নতুন সিনেমার বিজ্ঞাপনে হিরো আর পরিচালকের কথোপকথন করছেন। মেজাজ একটু ভালো হতে শুরু করল। সাময়িক। অচিরেই উপলব্ধি করলাম আধঘণ্টার অনুষ্ঠান, অ্যাড বাদ দিয়ে কুড়ি মিনিট, পরিষ্কার বাংলায় কথা বলতে পারে এমন একটাও সেলিব্রিটি নেই। 

কী নিয়ে পোস্ট লিখব?

নিকুচি করেছে পোস্টের। রিমোট ছুঁড়ে ফেলে ভাবছি এই বেলা ক্যান্ডি ক্রাশের লেভেলটা একটু বাড়িয়ে নিই, ভেবে ল্যাপটপ বুকের ওপর তুলতে যাচ্ছি, মনে পড়ল অনেক কিছু আছেও। 

অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত এখনও কণ্ঠস্থ আছে।

বাংলায় ব্যবহার হওয়া কুড়িটা সংস্কৃত উপসর্গ এখনও একদমে বলে যাওয়ার মতো ঠোঁটস্থ আছে। প্র পরা অপ সম নি অব অনু নির্‌ দুর্‌ বি অধি সু উৎ পরি প্রতি অভি অতি অপি উপ আ। (গুগল করিনি, অন গড ফাদার মাদার।)

বাংলা উপন্যাস পড়া, সিনেমা দেখার সদিচ্ছে এবং দেখাশোনার পর গুছিয়ে নিন্দে করার বদিচ্ছে ভরপুর আছে।

আর কিছুক্ষণ পর থেকে বাংলা চ্যানেলে চ্যানেলে যে নববর্ষ উদযাপন ধামাকা হবে, সেগুলো বসে বসে গেলার এবং শিউরে শিউরে ওঠার হাতে সময় আছে।

রসরাজে নববর্ষ স্পেশাল মাখাসন্দেশ আছে। নববর্ষ + রবিবারের সকালে কচুরি আলুরতরকারি আছে। সে কচুরির জন্য দোকান ওপচানো লাইন আছে।

আর সবথেকে বেশি করে যা আছে তা হচ্ছে প্রীতি আর শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। নববর্ষের পুণ্য অবসরে এবং তারপর গোটা বছর জুড়ে আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য।

নতুন বছর আপনারা সবাই ভালো থাকুন, বাংলাকে মাথায় তুলুন বা পায়ে দলুন, ধুতিশাড়িকে অঙ্গে জড়ান বা কুলোর বাতাস দিন, বাংলা বলতে-লিখতে-পড়তে পারা বা না-পারা নিয়ে গর্ব করুন, বাংলাতে গড়াগড়ি খান বা গুষ্টির তুষ্টি করুন। মনে রাখুন আপনি বাঙালি। বাংলা আপনার পোষা ছাগলছানা, তাকে আড়ে কাটবেন না বহরে সে বিষয়ে আপনার কথাই শেষ কথা।

শুভ নববর্ষ।



April 10, 2018

আ কোয়ায়েট প্লেস




সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া 'আ কোয়ায়েট প্লেস' একটি মনস্টার মুভি। মুভিতে মনস্টারের পরিচয় গোপন রাখা হয়নি কাজেই আমি বলে দিলে স্পয়লার হবে না। একটি জনমানবহীন জায়গায় বাস করে বাবা মা এবং চার সন্তানের একটি পরিবার। শুরুতেই দর্শক বুঝে যাবেন এঁদের জীবনযাপন স্বাভাবিক নয়, এঁরা খালিপায়ে হাঁটেন, পরিত্যক্ত ওষুধের দোকান ঘেঁটে ওষুধ এবং খাবারদাবার জোগাড় করেন। একটা ডিসটোপিয়ান বা ধ্বংসপরবর্তী পৃথিবীর চিহ্ন স্পষ্ট চারদিকে। ধ্বংসের কারণ এলাকায় আগত তিনটি জীব। আকৃতিতে যেমন বদখত, আচরণে তেমনি বীভৎস। এরা চোখে দেখে না কিন্তু শব্দ শুনতে পায় এবং শোনা মাত্র শব্দের উৎস আক্রমণ করে। আক্রান্ত হওয়া মানে একেবারে রক্তাক্ত মৃত্যু। এই পরিস্থিতিতে পরিবারটির বেঁচে থাকার সংগ্রামই সিনেমাটির প্লট।

আর থিম হচ্ছে বেঁচে থাকার রোজকার প্রক্রিয়ায় আমরা আমাদের যা যা অধিকার অচেতনে ব্যবহার করি, যেমন শব্দ উৎপাদনের স্বাধীনতা, সেগুলো সরে গেলে বা বলপূর্বক সরিয়ে নিলে জীবনের চেহারাটা কী অদ্ভুত অচেনা হয়ে যায়, সেইটা। শব্দের অনুপস্থিতি, বিশেষ করে আজকের যুগে, নজর করার ব্যাপার। সাইলেন্স গোল্ডেন এ প্রবাদ এখন ব্যাকডেটেড। সারাদিন কত কোলাহল করি, চেঁচাই, হাসি, গান গাই, রাগ দেখাই, কী বোর্ডে খটাখট টাইপ করি। এক মুহূর্ত নৈঃশব্দ্যের মধ্যে থাকতে পারি না, দায়ে পড়লে অস্থির হয়ে কানে গান গুঁজি। যদি বাধ্য করা হয় শব্দ উৎপাদন না করতে, নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বাঁচতে, তাহলে কেমন হয় ‘আ কোয়ায়েট প্লেস’ তার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

সিনেমাটা দেখতে গিয়ে আমার জশ ম্যালেরম্যানের বার্ড বক্স উপন্যাসের কথা মনে পড়ছিল। থিম দুটোরই এক। প্রতিমুহূর্তে ব্যবহার করা একটি প্রিভিলেজ, বাকি সব প্রিভিলেজের মতোই যাকে ক্রমাগত অচেতনে ব্যবহার করতে করতে আমরা প্রিভিলেজ বলে চিনতে ভুলেছি, সেটা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া। কোয়ায়েট প্লেসে সে প্রিভিলেজ শব্দ করার স্বাধীনতা, বার্ড বক্সে চোখ খোলা রাখার। বার্ড বক্সের মনস্টারটিকে অবশ্য আমরা দেখতে পাই না কখনওই, সে আমাদের অভিজ্ঞতার আড়ালে থেকে যায় সর্বক্ষণ এবং সেই জন্যই হয়ত কোয়ায়েট প্লেসের মনস্টারের থেকে বেশি সমীহ এবং আতংক আদায় করে নেয়। তাছাড়া এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মানুষের সম্পর্ক কীভাবে বদলায় বা এই অস্বাভাবিকতার চাপে মানুষের সম্পর্ক কীভাবে দুমড়েমুচড়ে যায়, বই এবং সিনেমা দুটিতেই সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বার্ড বক্সে সম্পর্কগুলো অচেনা কিছু প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মধ্যে যারা স্রেফ দুর্ভাগ্যবশতঃ একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থানে বাধ্য হয়েছে। আর কোয়ায়েট প্লেসে এই টানাপোড়েন ঘটছে একই পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে।

আ কোয়ায়েট প্লেস আমার ভালো লেগেছে। বেশ একটা দমবন্ধ ব্যাপার দেড়ঘণ্টা জুড়ে। এই সিনেমা দেখতে বসে রিং-এর মতো ভয় লাগবে আশা করলে হতাশ হবেন, কারণ আফটার অল রিং-এ ভিলেন সাক্ষাৎ ভূত আর কোয়ায়েট প্লেস-এ রক্তমাংসের নশ্বর দানব।

*****

বাই দ্য ওয়ে, পি ভি আর অনুপমে আপনারা যদি কখনও সিনেমা দেখতে যান, নুক্কড়ওয়ালায় খেয়ে দেখতে পারেন। মূলত স্ট্রিট ফুড বিক্রি হয়। চা, সামোসা, কিমা সামোসা, পাও ভাজি, চিঁড়ের পোলাও, উপমা, বান মাসকা, আলু টিক্কি বান, জলজিরা ইত্যাদি পাওয়া যায়। সব খাবারই অস্বাস্থ্যকর, কাজেই সুস্বাদু। দাম সস্তা, এসি আছে, অনেকক্ষণ বসে গল্প করা যায়। সাহস করে বিকেল পাঁচটা নাগাদ বড় এক গ্লাস মশলা কিংবা আদ্রক চায়ের সঙ্গে দু’খানা সিঙাড়া খেয়ে নিতে পারলে গ্যারান্টি অম্বল এবং রাতে খাবার গরম করা, খাওয়া, খাওয়াপরবর্তী বাসনমাজা থেকে মুক্তি। সাময়িক যে অস্বস্তিটুকু হবে, সেটা নিরাময়ের উপায় আছে নুক্কড়ওয়ালাতেই। একখানা ফটাফট কিনে নিন, মোটে চার টাকা দাম, কমলা রঙের প্যাকেটের ওপর কালো পোলকা ডট। নামের নিচে ‘আয়ুর্বেদিক’ আশ্বাস। এই বাজারে কাজে দেবেই দেবে। 

*****

কোয়ায়েট প্লেস দেখে এসে থেকে ভাবছি যে নিজের জীবনে সত্যি সত্যি কোয়ায়েট ক’টা প্লেস প্রত্যক্ষ করেছি। এই সিনেমার মতো বিপজ্জনক কোয়ায়েট নয়, ভালোজাতের কোয়ায়েট। নিরালা। সে নিরালায় দীর্ঘসময় থাকলে কেমন লাগত জানা নেই, কিন্তু অল্পসময়ের জন্য যারা আমাকে আরাম দিয়েছিল, এমনকি চমকে পর্যন্ত। সে রকম কয়েকটি জায়গার কথা নিচে লিখছি। 

১। সত্যিকারের সাইলেন্সের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা মুকুটমণিপুরে। হয়তো আগেও দেখা হয়েছে, কিন্তু ওইভাবে অনুভব করা সেই প্রথম। অথচ সেবারও অনুভব না করার বিস্তর কারণ ছিল। মাধ্যমিকের পর দিদিভাইরা বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন, ষোলোসতেরো বছরের একদল মেয়ে, বেশিরভাগ দশ বছর বা তারও পুরোনো বন্ধু, মুখ বুজে বিপাসনাধ্যান যে করতে যায়নি না সে তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু ইয়ুথ হোস্টেলে ব্যাগ রেখে বিকেলে বেড়াতে বেরিয়ে বাঁধের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে হাসি আর কথোপকথনের ফাঁক গলে একমুহূর্তের জন্য যেটা কানে এসেছিল, বা আসেনি, সেটা আমাদের কিছুক্ষণের জন্য চুপ করিয়ে দিয়েছিল। এ দুনিয়ার যেখানের যত আওয়াজ, এমনকি আমাদের নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস, হৃৎস্পন্দনও যেন ওই ড্যামের শান্ত জলে ডুব দিয়েছে। কোনও জায়গা যে অত নিস্তব্ধ হতে পারে, সেটা আমি সেই বিকেলে মুকুটমণিপুরের বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে স্বকর্ণে না শুনলে কল্পনা করতে পারতাম না। 

২। অধুনা উত্তরাখণ্ডের চম্পাবত জেলার মায়াবতী আশ্রমে গিয়েছিলাম বাবামায়ের সঙ্গে। সেভিয়ের নামে এক সাহেবমেম দম্পতি বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর উদ্বুদ্ধ হয়ে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রম সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই, তবে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দম্পতির বসতবাটিটি এখনও আছে। পাথরের, ঢালু ছাদওয়ালা সে বাড়িতেই ছিলাম আমরা। পেছনের বারান্দার গা দিয়ে খাদ নেমে গিয়েছিল আর সে খাদ থেকে শ্যাওলা ধরা প্রকাণ্ড গাছেরা উঠে গেছিল আকাশের দিকে। বারান্দার রেলিং আঁকড়ে ভীষণ সাবধানে নিচের দিকে ঝুঁকলে তাদের গোড়া দেখা যেত না, ঘাড় উঁচু করে আগা দেখার চেষ্টা করলে মাথা ঘুরত। ওই বারান্দা মতো শান্ত জায়গা আমি কমই দেখেছি।

৩। কিছু কিছু জায়গা ঠিক সে অর্থে শান্ত নয়। খুঁজে দেখলে সে সব জায়গায় আওয়াজ অনেক পাওয়া যাবে। পাখির আচমকা ডাক, নারকেল পাতার খসখস, প্রতিবেশীবাড়ি থেকে কথোপকথনের খণ্ড, ট্রেনের ভোঁ, এমনকি পাশের পাড়ার বিচিত্রানুষ্ঠানে সস্তা মাইকের তীক্ষ্ণ ক্যাঁ পর্যন্ত সবই আছে। শান্ত নয় কোনওমতেই, কিন্তু অকল্পনীয় শান্তির। রিষড়ার বাড়ির ছাদের কথা, রাতের আকাশের নিচে মাদুরের ওপর মায়ের পাশে শুয়ে থাকার কথা এই লিস্টে না লিখলে পাপ হত। তাই লিখলাম।

আপনার দেখা শান্ত (বা শান্তির) জায়গা বা জায়গাদের নাম যদি বলেন আমাকে, আমার খুব ভালো লাগবে। 



April 09, 2018

Nothing Good Gets Away




মন বলছে অবান্তরে বহুদিন আগে এই চিঠিটা ছেপেছিলাম, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছি না। যাই হোক, যদি ছেপেও থাকি, ভালো জিনিস একাধিকবার পোস্ট করলে ক্ষতি নেই। ছেলেকে লেখা জন স্টেইনবেকের চিঠি। 

*****

New York
November 10, 1958


Dear Thom:

We had your letter this morning. I will answer it from my point of view and of course Elaine will from hers.

First -- if you are in love -- that's a good thing -- that's about the best thing that can happen to anyone. Don't let anyone make it small or light to you.

Second -- There are several kinds of love. One is a selfish, mean, grasping, egotistical thing which uses love for self-importance. This is the ugly and crippling kind. The other is an outpouring of everything good in you -- of kindness and consideration and respect -- not only the social respect of manners but the greater respect which is recognition of another person as unique and valuable. The first kind can make you sick and small and weak but the second can release in you strength, and courage and goodness and even wisdom you didn't know you had.

You say this is not puppy love. If you feel so deeply -- of course it isn't puppy love.

But I don't think you were asking me what you feel. You know better than anyone. What you wanted me to help you with is what to do about it -- and that I can tell you.

Glory in it for one thing and be very glad and grateful for it.

The object of love is the best and most beautiful. Try to live up to it.

If you love someone -- there is no possible harm in saying so -- only you must remember that some people are very shy and sometimes the saying must take that shyness into consideration.

Girls have a way of knowing or feeling what you feel, but they usually like to hear it also.

It sometimes happens that what you feel is not returned for one reason or another -- but that does not make your feeling less valuable and good.

Lastly, I know your feeling because I have it and I'm glad you have it.

We will be glad to meet Susan. She will be very welcome. But Elaine will make all such arrangements because that is her province and she will be very glad to. She knows about love too and maybe she can give you more help than I can.

And don't worry about losing. If it is right, it happens -- The main thing is not to hurry. Nothing good gets away.

Love,
Fa


April 07, 2018

গরম আসাতে



গাছপালা জীবজন্তুরা কথা বলতে পারে কি না এ নিয়ে আলোচনা এই ক’দিন আগে অবান্তরেই হচ্ছিল। আমাদের মতো করে না হলেও নিজেদের মতো করে পারে বলেই আমি বিশ্বাস করি। এমনকি আমাদের মতো করে আমাদের সঙ্গেও কথা বলতে পারে। শীতে আমাদের বারান্দার কারিগাছ একেবারে ঝিমিয়ে, শুকনো হয়ে আধমরা হয়ে পড়েছিল। অর্চিষ্মান আর আমি জল দিতে দিতে আলোচনা করতাম এই শীতটা বোধহয় আর কাটল না। নিচু গলাতেই করতাম কারণ কারিগাছের কানে গেলে খারাপ লাগতে পারে। যেই মার্চ মাস পড়েছে আর সূর্য একেবারে তেড়েফুঁড়ে বারোঘণ্টা বারান্দায় আলো দিচ্ছে, কারিগাছ একেবারে নতুন পাতায় ঝলমলিয়ে উঠেছে। জল দিতে গিয়ে আমরা বলছি, উফ কারিদা, হেবি মাঞ্জা দিয়েছ তো, শুনে পাতাগুলো এমন হেলেদুলে উঠছে ওটা আমাদের ভাষায় ‘হেঃ হেঃ’ ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। পেছনের গলি দিয়ে যাতায়াত করা কুকুরবেড়ালরা তো আমাদের সঙ্গে নিয়মিত ইন্টারঅ্যাকট করে। মোড়ের মাথার বাড়ির দোতলার পাগ, আমি ঝালমুড়ির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে ওর দিকে না তাকালে সংক্ষিপ্ত একটা ‘ঘোঁক’ করে। মুখ তুললেই বিরক্ত মুখে বলে, ‘কী রে, ঝালমুড়ি খেয়ে খুব দেমাক দেখছি, তাকাচ্ছিসই না,’ তারপর জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলে, ‘কেমন বানিয়েছে রে? ঝালটাল নুনটুন সব ঠিকঠাক?’ গলিতে কুচকুচে কালো একটা বেড়াল থাকে, অত লম্বা বেড়াল আমি দেখিনি কখনও। ওর ভাইবেরাদররা আমাদের সাড়া পেলেই বেওয়ারিশ ধুলোময় মারুতির নিচে সেঁধোয়, আর ও ‘ঘুরতা কিউঁ বে?’ ভঙ্গিতে চোখে চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না আমরা চোখ সরিয়ে নিচ্ছি।

আমরা তো মনে করি যাদের আমরা অপ্রাণিবাচক বলি, খাটবিছানা চেয়ারটেবিল, তাদেরও মনমেজাজ, ভাষা আছে। এই যে আমি আমার যত টাইমপাস সব নতুন টেবিলে বসে করছি আর পুরোনো টেবিলে কেবল জলের বোতল আর গ্যাসের রিসিট আর ছুঁড়ে ফেলা চাবি, এমনকি বাহারি ল্যাম্পপোস্টটা পর্যন্ত ওর থেকে কেড়ে নতুন টেবিলকে দেওয়া হয়েছে, এতে ওর কোনও ট্রমা হয়নি? বা ফ্রিজের পুরোনো ডাল নতুন চাউমিনের দেমাক দেখে নিজের মনেই (কিন্তু চাউমিন যাতে স্পষ্ট শোনে ) সুর করে ‘ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে’ বলে না? হতেই পারে না। নড়েচড়ে না বলে ওদের কথাবার্তা আমরা শুনতে পাই না হতে পারে, কিন্তু সেটা আমাদের শোনার দোষ। ওদের বলার অভাবের নয়।। 

নিজেদের কথাবার্তা ফুরিয়ে গেলে বা নিজেদের নিয়ে কথা বলতে বলতে বোর হয়ে গেলে আমি আর অর্চিষ্মান অনেক সময় ওদের হয়ে কথাবার্তা চালাই। এরা ছাড়াও আমাদের চারপাশে আরেকদল আছে, যাদের মন মাথা ভাষা থাকার সম্ভাবনা ডাল চাউমিনের থেকে কম নয় বরং বেশি অথচ আমরা তাদের সম্পূর্ণ ইগনোর করি, তাদের ডায়লগের সম্ভাবনা তলিয়ে দেখি না। এরা হল হাওয়াবাতাস, রোদ, বৃষ্টি, নিম্নচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি, সব মিলিয়ে যাদের আমরা বলি আবহাওয়া। 

বুদ্ধিমান লোকেরা অবশ্য এদের বুদ্ধিমান বলে চিনতে পারেন এবং ইগনোর করেন না। সুনীল গাঙ্গুলি একবার লিখেছিলেন, হাওয়ারা জানালা দিয়ে ঢোকার আগে উঁকি মেরে দেখে নেয় বেরোনোর জানালা আছে কি না, থাকলে তবে ঢোকে, না হলে বেটার জানালার সন্ধানে চলে যায়। কোনও এক বছর মৌসুমী বায়ু আসতে ভুল করায় চন্দ্রিল দুয়ো দিয়েছিলেন। ব্যাটা ভালো করে ভূগোল পড়েনি, তাই খালি খালি রাস্তা ভুল করে ফেলছে। 

এ বছর আবহাওয়ার জলজ্যান্ত হওয়ার প্রমাণ হাতেনাতে পেলাম। মার্চ মাসের শেষ দিকটাতেও তেমন গরম পড়ছে না দেখে আমরা বেশ অবাকই হয়ছিলাম। সকালে বেরোনোর সময়েও রোদের তাপ মনোরম, এমনকি দুপুরবেলা আন্টিজির দোকানে হেঁটে যেতেও গায়ে লাগছে না, বাড়ি ফিরে এসির বদলে ফ্যানেই দিব্যি কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। একত্রিশে, আমার স্পষ্ট মনে আছে, একত্রিশে মার্চ খাওয়াদাওয়া সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আলতো হাওয়া খেতে খেতে আমি আর অর্চিষ্মান আলোচনা করলাম, মেলাগ্রাউন্ডে হাঁটতে যাওয়া শুরু করি চল। আলোচনা সেরে শুতে গেলাম, পয়লা এপ্রিল সকালবেলা উঠে দেখলাম শরীরের এখানেওখানে ঘাম, ওলার জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাঁদি ফাটার জোগাড়, আন্টিজির দোকানে হেঁটে হেঁটে যেতে গিয়ে শপথ নিলাম দুপুরের চা এবার থেকে অফিসেই। বাপ রে বাপ রে বাপ। রাতে খাওয়ার পর এসির নিচে লম্বা হওয়ার সময় একে অপরের চোখাচোখি এড়িয়ে গেলাম, ভাব করলাম যেন মেলাগ্রাউন্ডে হাঁটতে যাওয়ার আলোচনাটা ঘটেইনি কোনওদিন। 

গ্রীষ্মটা যেন এতদিন ঘড়ির দিকে চোখ রেখে কোমরে হাত দিয়ে পায়ে টোকা মারছিল, যেই না সেকেন্ডের কাঁটা এপ্রিলের ঘরে ঢুকেছে, গরম হাওয়া, ঝাঁ রোদ্দুর, ঘাম আর ঘামাচির লোকলস্কর নিয়ে ‘টাইম’স আপ!’ হুংকার দিয়ে লাফিয়ে পড়েছে আমাদের ঘাড়ে।


*****

গরম আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, সেটা হচ্ছে দইচোর। প্রতিবছরই ঘটে। অফিসের কেউ কেউ বাড়ি থেকে ছোট টিফিনবাক্সে দই নিয়ে আসেন, কেউ কেউ অফিসসংলগ্ন মাদার ডেয়ারি থেকে দই জোগাড় করান। সে সব মাদার ডেয়ারির দই ফ্রিজে রাখা থাকে। এবং মাঝেমাঝেই ন্যায্য মালিকের হাতে পৌঁছোয় না। 

চুরিটা চোরের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু চুরির পরের চেঁচামেচিটা নির্ভর করে দইয়ের মালিকের ওপর। এক, দই না পেলে অন্যান্য সম্ভাবনার (যেমন কেউ ভুল করে নিয়ে নিয়েছে) বদলে চুরির কথাই প্রথমে মাথায় আসে কি না। দুই, যদি মাথায় আসেও, দশ টাকার দইয়ের জন্য তিনি কত হল্লা জুড়তে পারেন। কারও কারও ক্ষেত্রে একা ডিরেক্টর ছাড়া কারও জানতে বাকি থাকে না যে অমুকের দই চুরি গেছে। ক’দিন আগে সে রকম একজনের দই হারিয়েছিল। সে এক কাণ্ড। বলা বাহুল্য এই চেঁচামেচির মধ্যে একটা ফিল গুড ব্যাপার থাকে। সাধারণত দইচুরি ধরা পড়ে লাঞ্চের পর। এই সুযোগে হোয়াট হ্যাপেনড বলে সিট ছেড়ে ওঠা যায়, পকেটে হাত দিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে প্যান্ট্রি কিংবা প্যাসেজে দাঁড়িয়ে গজল্লা করা যায়, পাশের জনের ঘাড়ে হাত দিয়ে বলা যায়, আরে সিসিটিভি লাগানোর ব্যবস্থা কর ভাই, আজ না হয় দইয়ের ওপর দিয়ে গেছে, এইবেলা স্টেপ না নিলে বিরিয়ানিও বাদ থাকবে না। বন্ডিংও হয় টিফিনের পরের ঝিমুনিটুকুও কাটে।

*****

দইচুরি নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না, কিন্তু দইয়ের বদলে যদি রক্ত চুরি হয়, তাও আবার নিজের, তখন মাথা ঘামাতেই হয়। গরমের সঙ্গে এসেছে মশা। পালে পালে, কাতারে কাতারে। বোঁ বোঁ রণহুংকারে রীতিমতো কলজে কেঁপে যায়। মাঝরাতে সারাগায়ে ছুঁচ ফোটানোর অনুভূতি। তারপর অন্ধকার ঘরে অলআউটের জন্য হাতড়ানো। বালিশের পাশে খুলে রাখা চশমাই আমি খুঁজে পাই না, তিনমাস আগে শেষ ব্যবহার করা অলআউট খোঁজা, তাও আবার রাত দেড়টার সময়, চশমা ছাড়া। ভাবুন একবার। শীতের শুরুতে বাড়িতে চারটে অলআউট ছিল স্পষ্ট মনে আছে, মাঝরাতে হাঁটকে অতি কষ্টে একটা পাই, তাও ফাঁকা, চোখ খুব সরু করলে একটুখানি তলানি চোখে পড়ে। 

ব্যাপারটা আরও গাত্রদাহকর কারণ গোটা প্রক্রিয়া জুড়ে অর্চিষ্মান অকাতরে ঘুমোতে থাকে। সব মশা কামড়ায় না, জীবনবিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম, বিশ্বাসও করেছিলাম কারণ সায়েন্স, কিন্তু মশা যে সবাইকে কামড়ায় না এটা ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম এবং বিশ্বাস করিনি কারণ আনসায়েন্টিফিক। পৃথিবীর সব মানুষের রক্তের রং এক হ্যানাতানা মিছিলের স্লোগান হয় বটে কিন্তু ঠাকুমা বলতেন সব মানুষের রক্তের স্বাদ এক নয়। কারও মিষ্টি, কারও তেতো। মশারা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। আর আমার রক্ত, আমার ঠাকুমার রক্তের মতোই, এক্সট্রা মিষ্টি। 

অর্চিষ্মানের নিশ্চয় বিষতেতো। আমি রোজ রাতে পাগলের মতো নিজের সারাগায়ে চাপড় মারতে মারতে উঠে বসে থাকি, ছ’ইঞ্চি পাশে অর্চিষ্মান অকাতরে ঘুমোয়। বললে বিশ্বাস করবেন না, সকালবেলা ওলাতে চড়লে গাড়ির ভেতরের মশাগুলো পর্যন্ত বোঁ বোঁ করে আমাকেই কামড়াতে আসে, অর্চিষ্মানের কাছ ঘেঁষে না।

আপনার রক্ত মিষ্টি না তেতো?



April 02, 2018

দিদিমার ভাবনা







উনিশশো তিরিশে প্রকাশিত অ্যামেরিকান লেখক ক্যাথরিন অ্যান পোর্টারের লেখা ছোটগল্প The Jilting of Granny Weatherall-এর ছায়া অবলম্বনে লেখা আমার ছোটগল্প ‘দিদিমার ভাবনা’ বেরিয়েছে এ সংখ্যার চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ক্যাথরিন অ্যান পোর্টার পুলিৎজার এবং ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডস সহ আরও বিবিধ পুরস্কার পেয়েছিলেন। উপন্যাস, প্রবন্ধ, সংবাদধর্মী রচনা সবরকম লেখা ভীষণ ভালো লিখলেও পোর্টারের আসল কেরামতি ছিল তাঁর ছোটগল্পে।

The Jilting of Granny Weatherall ক্যাথরিন অ্যান পোর্টারের বিখ্যাততম ছোটগল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ গল্প নিয়ে সিনেমাও হয়েছে পরে। উইকিপিডিয়ায় লিখেছে ক্যাথরিন পোর্টারের লেখায় প্রতীকের ব্যবহার, পয়েন্ট অফ ভিউ-র অভিনবত্বের কথা, এ গল্পে তা ভরপুর রয়েছে।

গল্পের সম্পূর্ণটা ঘটছে একজন চরিত্রের মাথার ভেতর। স্ট্রিম অফ কনশাসনেস, কিন্তু পোর্টার সে চেতনাকে একেবারে খোলা না বইয়ে গল্পের ছাঁদে বেঁধেছেন, আমিও সেটাই অনুসরণ করেছি। যেখানে অনুসরণ করিনি তা হচ্ছে ঘটনাপ্রবাহে। আমার গল্পের দিদিমার সঙ্গে অ্যামেরিকান দিদিমা ওয়েদারঅলের জীবন মেলেনি, তাই সেই জীবনের স্মৃতিও তাঁদের ভিন্ন হয়েছে।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.