March 28, 2017

উঠতে বসতে



লটারি জাতীয় ব্যাপারে আমার কপাল কখনওই ভালো হয় না। ছোটবেলায় একবার সেজকাকুর হয়ে বঙ্গলক্ষ্মী না কীসের একটা টিকিট পছন্দ করেছিলাম, লাগেনি। অফিসে বছর বছর দেওয়ালিতে তাম্বোলা নামের এক বিভীষিকা হয়, লোকজন ডাইনেবাঁয়ে কফি মাগ থেকে ক্যাডবেরি জেতে, আমি গোল্লা পাই। ডি ডি এ ফ্ল্যাটের লটারিতেও নাম লিখিয়েছিলাম বছরকয়েক আগে, যথারীতি নাম ওঠেনি। 

একমাত্র একটি ব্যাপারে আমার কপাল আশ্চর্যরকম খোলে, সেটা হচ্ছে হোটেলের ঘর। বেড়াতে গেলে কপালের ভাগ কম, যেমন ভাড়া দেব, তেমনই ঘর পাব। কিন্তু কাজে গেলে ঘর অন্যে বুক করে রাখে, দরজা খুলে ঢোকার আগে আঁচ করা অসম্ভব কপালে কী নাচছে। লটারিই হল একরকম। সে সব লটারিতে আমার কপাল বেশিরভাগ সময়েই অত্যন্ত ভালো। 

যেমন ধরুন, যেবার সারিস্কা গিয়েছিলাম অফিসের সঙ্গে। এক রাজবাড়ি-কাম-হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। কেউ রাজার ঘর পেল, কেউ রানীর ঘর। সবাই ছোটাছুটি করে সে সব ঘর দেখতে গেল। আমাদের অ্যাডমিন হাত তুলে দিয়ে বললেন, আমি বাবা কিছু করিনি, যার যেমন কপাল তেমন পেয়েছ। আমি যে ঘরটা পেলাম সেটা খুব সম্ভবত সেনাপতির। যথেষ্ট আরামদায়ক, কিন্তু মেঝে ফুঁড়ে ফোয়ারা বেরোয়নি। ঘরপ্রতি দু’জন করে থাকবে। আমার ঘরে আমার সঙ্গে কে থাকবে জানা ছিল না। আমার অফিসে কোনও বন্ধু নেই, শত্রুও না, যে আসবে তাকেই মাথা পেতে নেব ভঙ্গি করে বসে রইলাম। কেউ আসে না, আসে না, শেষ পর্যন্ত এলই না। রাজারানীর খাটে লোকজন দু’জন করে শুয়ে রাত কাটালো, আমি সেনাপতির খাটে একা স্টার ফিশ হয়ে শুয়ে খুব হাসলাম।

আরেকবার ট্রেনিং দিতে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে, আশেপাশে কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ একখানা আখাম্বা হোটেল। খেলানো বাগান, বাগানে ভাঙা পরী, করিডরের দেওয়ালে সারি দিয়ে টাঙানো চিনামাটির প্লেটে আঁকা সাহেবমেম, কোণে কোণে রাখা অ্যান্টিক সিন্দুকে জাফরি দিয়ে আসা রোদের কাটাকুটি। ওখানে আমরা থাকব তিনরাত্তির। কে কোন ঘরে থাকবে ঠিক করা নেই। একে একে রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে চলে যাও। আমিও গিয়ে ঘরে ব্যাগপত্র রেখে খুশি খুশি মুখে ডাইনিং রুমে এসেছি, দেখি সবার মুখ হাঁড়ি। সব বাহার নাকি বাইরেই, ঘর কহতব্য নয়। কারও ঘরে জানালা খোলে না, কারও বন্ধ হয় না,  কারও কারও বাথরুম এত ছোট, যে বেসিনটা বেসিক্যালি শোবার ঘরে। কারও এসি কাজ করছে না,আর ইন্টারনেট তো কারওরই নেই। সবাই ভয়ানক রেগে গিয়ে আমার দিকে তাকাল। হাউ’জ ইয়োরস? আমি একবার ভাবলাম বলব নাকি যে আমার অ্যাকচুয়ালি ইজ নয়, আর। একটা বসার ঘর, একটা শোওয়ার, বাথরুমে একখানা ছোটমতো টাবও আছে। শোওয়ার ঘরের জানালা বাইরে বাগানের ভাঙা পরী পেরিয়ে দিগন্তজোড়া জঙ্গলের মাথায় সূর্যাস্তের আকাশ। আর বসার ঘরে সোফা, যার ওপর আধশোয়া হয়ে এতক্ষণ অর্চিষ্মানের সঙ্গে স্কাইপ করছিলাম, তাই নামতে একটু লেট হয়ে গেল।

মনে আছে জল খাওয়ার ছুতোয় মুখে লেগে থাকা হাসিটুকু গিলে ফেলে গম্ভীর মুখে বলেছিলাম, কী আর বলব। 

বেজিং-এও আমার কপাল যথারীতি ভালোই ছিল। বেজিং-এ অবশ্য কারও কপালই খারাপ ছিল না। সব ঘরই ভালো, কেবল কোণের ঘরগুলো, যার একটা আমি পেয়েছিলাম, সেটা একটু বেশি ভালো। 

তবু সে ঘরে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। প্রথম কথা তো নিজের বাড়িতে ব্যবস্থাপত্র যতই খারাপ হোক না কেন আরাম ঢের বেশি হয়, তাছাড়া অর্চিষ্মান থাকে। কিন্তু এ সব তো সব হোটেলের ক্ষেত্রেই সত্যি। বেজিং-এর হোটেলবাসের বাড়তি প্রাণান্তকরতাটুকু হচ্ছে ইন্টারনেটের অভাব। ইন্টারনেট আছে, তার স্পিডও সাংঘাতিক। কিন্তু দেখব কী? গুগল নেই, ইউটিউব নেই, এমনকি অবান্তরও নেই। 

সেই দু’হাজার নয়ের সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত এমন বেশ কয়েকবার হয়েছে যে আমি টানা সাতদিন লিখিনি। কিন্তু এমন একবারও হয়নি যে আমি টানা সাতদিন অবান্তরের মুখ না দেখে থেকেছি। ব্যাপারটা যে কতখানি অদ্ভুত সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, তাই আমি চেষ্টাও করছি না। 

কাজ শেষ হল যখন তখন আমার সহ্যশক্তি শেষ সীমায়। এয়ারপোর্টে পৌঁছে সঙ্গীরা গেল ডিউটি ফ্রি শপিং করতে, আমি নির্দিষ্ট গেটের কাছে বসলাম। অবান্তর তখনও দেখা যাবে না, কিন্তু নেক্সট বেস্ট যেটা, অবান্তরের জন্য পোস্ট লেখা, সেটা করা যাবে। সিটে বসে ল্যাপটপ খুলে নিষিদ্ধ নগরীর গল্প টাইপ করতে শুরু করেছি, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। 

ঘটনাটাকে ঘটনা বলে তখন তো আর চিনতে পারিনি, তখন দেখলাম একজন রোগাপাতলা ভদ্রলোক, এয়ারপোর্টের কর্মচারীর উর্দি গায়ে, বাঁ হাতে একতাড়া কাগজ, ডানহাতে একখানা পেন, এসে আমার পাশের ফাঁকা সিটে বসলেন। খানিকক্ষণ পর আমার চশমার ফ্রেমের কোণায় একটা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন উঁকি মারল। ফোনটা ধরে একখানা ফর্সা কবজি। আমি মুখ তুললাম। ভদ্রলোক হাসিহাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভুরু নাচিয়ে স্ক্রিনের দিকে দেখালেন। 

ওই স্ক্রিনটা আমি গত ক’দিনে দেখেছি বেশ কয়েকবার। বেসিক্যালি, ট্রানস্লেশন অ্যাপ। তুমি তোমার ভাষায় একটা কিছু টাইপ করলে সেটা অন্য ভাষায় অনুবাদ হয়ে যাবে। আপাতত যে ভাষাটা স্ক্রিন থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা ইংরিজি। ভদ্রলোক আমার সুবিধের জন্য অডিও চালু করে দিলেন, এবার ফোন থেকে এক ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর যান্ত্রিক গলা আমাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, ক্যান ইউ টিচ মি হাউ টু ডু ইট?

টিচ? হোয়াট? 

ভদ্রলোক কোলের কাগজের তাড়ার ওপর ফোন নামিয়ে রেখে দু’হাত সামনে শূন্যে বাড়িয়ে ধরে দশ আঙুল নাড়ালেন কয়েকবার। চোখ বুজে। 

মূকাভিনয় আর দু’চারটে ইংরিজি শব্দ মিলিয়ে যা বুঝলাম, ভদ্রলোক আমার টাইপিং-এর স্পিড,  তাও আবার কি-বোর্ডের দিকে না তাকিয়ে, দেখে এমন অভিভূত হয়েছেন যে আমার থেকে এ বিদ্যেটি শিখতে চান।

প্রথমেই একটা পুরোনো দুঃখ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমার মুখের মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে যে লোকে যেচে এসে আমাকে নিয়ে ঠাট্টামশকরা করে যায়। এ আমি বারবার দেখেছি। দুঃখটা খানিকটা কমলে দু’নম্বর চিন্তাটা হল। আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে ভালো করে তাকালাম, মাথা খারাপ তো মনে হচ্ছে না। চাকরিবাকরি করে খাচ্ছেন যখন। তিন নম্বর সম্ভাবনাটাই সবথেকে ভয়ের। ল্যাপটপ ব্যাগটা পায়ের সামনে রাখা ছিল। আমি যথাসম্ভব গোপনে পা-টা সামান্য এগিয়ে ব্যাগটাকে নিজের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করলাম, বিশেষ সুবিধে হল না। 

তারপর কাঁচা বয়সের এক বন্ধুর শিক্ষা মনে পড়ল, যা হচ্ছে সব ফেস ভ্যালুতে নিতে শেখ। ভদ্রলোক বন্ধুত্বপূর্ণ, তাই আমার সঙ্গে আলাপ করছেন। আমিও হেসে প্রতি- আলাপ করলাম। এ কথা সে কথা হল, ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আর ইউ দ্য বস্‌? 

আমি কান্নাটাকে হাসির চেহারা দিয়ে সত্যিটা স্বীকার করলাম। বললাম, বস তো দূর অস্ত, আমি হচ্ছি গিয়ে সারভেন্টস্য সারভেন্ট। ভদ্রলোক জোরে জোরে মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করতে লাগলেন। এত জোরে যে টাইপ করে সে বস না হয়ে যায় না। এমন সময় পেছন থেকে আরেকটি গলা কানে এল। 

ইউ আর রাইট, দিজ পিপল আর দ্য বসেস ইন ইন্ডিয়া নাউ।

আমাদের অদ্ভুত কথোপকথন যে আরও লোকজনের কানে গেছে সেটা বুঝিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম দু-তিনটে সিট ওপাশে দু’চারজন লোক বসে আছে, আমাদের দেশের, তাদের মধ্যে একজন হাসিমুখে আমার চোখে চোখ ফেলে তাকিয়ে আছেন। এর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ভদ্রলোকের কাজের ডাক এসে গেল, তিনি মাথা খুব করে ঝাঁকিয়ে আমাকে টা টা করে চলে গেলেন। আমি আবার টাইপ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে সুতো ছিঁড়ে গেছে। নিষিদ্ধ নগরীর গল্পেরা ব্যাকস্টেজে, সামনের স্টেজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আরও দুটো শব্দ। 

দিজ পিপল। 

আমাকে কোন পিপলদের সঙ্গে এক গোত্রে বসাচ্ছেন উনি ভাবার চেষ্টা করলাম। চশমা-পরা পিপল? নাক থ্যাবড়া পিপল? চুল পাকা পিপল?  কোনওটাই জুৎসই লাগল না। চশমা পরা, নাক থ্যাবড়া বসে দেশ ছেয়ে গেছে এ কথা সত্যি, কিন্তু সেটা ওঁকে কোনও ভাবে বিচলিত করতে পারে মনে হল না।

আরও এক রকমের ‘পিপল’-এর মধ্যে আমি পড়ি বটে। মেয়েদের মধ্যে। মেয়েরাই যে আজকাল চতুর্দিকে বস হয়ে উঠছে, এই ব্যাপারটাই ওঁকে রসিকতা করতে বাধ্য করেছে ধরে নিলাম আমি। 

দু’তিনটে অনুভূতি একসঙ্গে মারামারি করছিল জায়গা নেওয়ার জন্য। রাগ, অপমান, মনখারাপ। কোনওটাই আমার রুগ্ন মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে সুবিধেজনক নয়।  

আরেকবার লোকটার দিকে তাকালাম। এখন লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। ওই বয়সের বেশিরভাগ ভারতীয় পুরুষকে যেমন দেখতে হয়। মাঝারি ভুঁড়ি, মাঝারি টাক। আপাদমস্তক মাঝারি চেহারা। বলার মতো কোনও প্রিভিলেজ চুঁইয়ে পড়ছে না (বিদেশী এয়ারপোর্টে বসে থাকার অবভিয়াস প্রিভিলেজটা ছাড়া)। 

অথচ জন্মসূত্রে এ আরেকটা প্রিভিলেজ পেয়েছিল। পুরুষ হয়ে জন্মানোর প্রিভিলেজ। কোনও পরিশ্রম, কোনও স্ট্রাগল করতে হয়নি, জাস্ট একটি প্লেজেন্ট অ্যাকসিডেন্ট। ব্যস। এখন ক্ষেত্রবিশেষে সে প্রিভিলেজ মুঠো গলে পালিয়ে যাচ্ছে যখনতখন। আর সেই সঙ্গে রাগ বাড়ছে। কমছে প্রকাশের সুযোগ। এখন জোকসের মুখোস পরিয়ে রাগগুলো বার করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই, মাঝারি লোকেদের কাছে। 

ব্যাপারটা খুবই বেদনার, অ্যাকচুয়ালি। 

রাগের বদলে করুণাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। সান্ত্বনা দেওয়ার কথাও মাথায় এসেছিল একবার, কিন্তু ততক্ষণে বোর্ডিং-এর লাইন দেওয়ার নির্দেশ এসে গেছে।


March 24, 2017

বেওয়ারিস বাংলা



“আজকাল বাঙ্গালী ভাষা আমাদের মত মূর্ত্তিমান কবিদলের অনেকেরই উপজীব্য হয়েচে, বেওয়ারিস লুচীর ময়দা বা তইরি কাদা পেলে যেমন নিষ্কর্ম্মা ছেলেমাত্রেই একটা না একটা পুতুল তইরি করে খ্যালা করে, তেম্‌নি বেওয়ারিস বাঙ্গালী ভাষাতে অনেকে যা মনে যায় কচ্চেন; যদি এর কেও ওয়ারিশান থাক্‌তো, তা হলে ইস্কুলবয় ও আমাদের মত গাধাদের দ্বারা নাস্তা নাবুদ হতে পেতো না -  তা হলে হয় ত এত দিন কত গ্রন্থকার ফাঁশী জেতেন, কেউ বা কয়েদ থাকতেন; …”
                                                                                                   
                                                                                                 — হুতোম প্যাঁচার নকশা



March 23, 2017

দিল্লি বইমেলা, বাংলা বই



আমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলাম মার্চ মাসটা আমার সবদিক থেকে খারাপ যাবে। বেজিং যাওয়া নিয়ে গোড়াতে একটা আধোউত্তেজনা ছিল, মিথ্যে বলব না, কিন্তু যতই যাত্রার দিন এগোতে লাগল, যতই স্পষ্ট হতে লাগল যে ওখানে ঘটনাটা কী ঘটতে চলেছে ততই আমার যাওয়ার কথা মনে পড়তেই কান্না পেতে লাগল। তারপর একদিন খবর পেলাম করলাম যে আমার দিল্লিতে না থাকা আর দিল্লি বাংলা বইমেলার দিনক্ষণ প্রায় কাঁটায় কাঁটায় মিলে গেছে। শুরুটা তো মিস করবই, শনিবার সন্ধ্যেবেলায় বইমেলা মঞ্চে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তারকাদের একটা আলোচনাসভা আছে, সেইটা মিস হয়ে যাবে। ফিরবও মেলাশেষের দিন কাকভোরে। তখন ঘুমোনোর বদলে মেলা ঘুরতে যাওয়ার উৎসাহ আজ থেকে বছর দশেক আগে থাকলেও থাকতে পারত, এখন নেই। 

মেলায় যাওয়ার একটা প্রধান উদ্দেশ্য তো বই কেনা থাকেই, কিন্তু সত্যি বলছি দিল্লির বাংলা বইমেলায় যাওয়ার উৎসাহটা বইসংক্রান্ত নয়। সে তো আজকাল অনলাইনেই কেনা যায়। দিল্লি বইমেলা যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছ, যাদের ঘাপটি মেরে আড়াল থেকে দেখি, তাদের স্বমহিমায় রক্তেমাংসে দেখার। 

অর্চিষ্মানেরও মনখারাপ হল। একা একা বইমেলা যাওয়ার আনন্দ দুজনে মিলে বইমেলা যাওয়ার আনন্দের অর্ধেক নয়, উল্টে নিরানন্দ ডবল। তবু আমি বললাম, তোমাকে যেতেই হবে, না হলে আমি গল্প শুনব কার কাছে। তোমার ঘোরায় আমার অর্ধভ্রমণ। 

অর্চিষ্মান গেল, ঘুরল, বই কিনল, লেখকদের আলোচনা শুনল, কনট প্লেসে বিরিয়ানি খেয়ে ফিরে একটু এলিয়ে নিয়ে আমাকে আনতে গেল এয়ারপোর্টে। দুজনে রাত সাড়ে তিনটেয় বাড়ি ফিরলাম। ন’টা পর্যন্ত ঘুমোলাম। ন’টার সময় ঘুম ভেঙে উঠে দেখি ক্লান্তি তো একটুও নেই, বাড়ি ফেরার আনন্দে শরীরমনে এনার্জি ঢেউ খেলছে। মনের কথা মুখ ফুটে বলতে হল না, চোখে চোখেই প্ল্যান হয়ে গেল, দুপুরের খাওয়া সেরে অটো ধরে চলে গেলাম দিল্লি কালীবাড়ি। 

মেলায় পা রাখামাত্র চারদিক থেকে ঘাড়ে লাফ দিয়ে পড়ল বাংলা কথা, বাংলা অক্ষর, জাম্বো টিপ, কবিতা-পাঞ্জাবী। আহ্‌ কী শান্তি, কী আরাম। বাংলা নাটক নিয়ে গোলটেবিল শুনলাম খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে, তারপর মঞ্চে সংবর্ধনা আর আলোচনা। আর এত বইয়ের মধ্যে পড়ে যেহেতু সংযম প্র্যাকটিস করা সম্ভব নয়, তাই বইও কেনা হল। বইমেলায় বই কেনার অভিজ্ঞতাটাই সবথেকে মারাত্মক। কেউ কেউ রীতিমত তাড়া করেন। আমি তাঁদের দোষ দিচ্ছি না। বিক্রির অবস্থা এত করুণ যে ঝুলোঝুলি না করে তাঁদের উপায় নেই। কিন্তু আমরা ভীতু মানুষ, তাড়ার ভয়ে একটা গোটা গলি সর্বক্ষণ এড়াতে হল। আরেক দোকানে গিয়ে যেই না একখানা বই হাতে তুলেছি, অমনি বিক্রেতার মুখ হাঁড়ি। বললেন, এ তো চেনা-চেনা খেলা। সকলেই নিজেদের চেনা লোকের বই কেনে। আমি তাঁকে হাতে পায়ে ধরে বোঝাতে চাইলাম যে আমি লেখককে মোটেই চিনি না, শুধু নাম জানি আর সামান্য কৌতূহল আছে। 

ওই একই হল। 

হয়তো একই হল। আমি যথাসম্ভব সরিটরি বললাম, তাড়াতাড়ি একজন অচেনা লেখকের বইও নিলাম, যাতে ওঁর রাগটা একটু কমে। কাজ দিল কি না বোঝা গেল না। কী রকম ঠোঁট ছেতরে বললেন, আরে নিন নিন যা নেওয়ার, তবু যে বই পড়ছেন এই যথেষ্ট। 

আপাতত মার্চ মাস দারুণ ভালো যাচ্ছে। বইমেলা থেকে কেনা সব বই ডাঁই করে রেখেছি বিছানার পাশের টেবিলে। অফিস বেরোনোর আগে কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার আগে নেড়েচেড়ে বেছেবুছে একটা তুলে নিই। রোগা বই, মোটা বই, শক্ত কথা সোজা ভাবে লেখা বই, সোজা কথাকে বেঁকিয়েচুরিয়ে লেখা বই, জলবৎতরলং বই, দাঁতভাঙা বই। বুঝতে পারি না পারি, প্রতিটা শব্দে যত্ন করে চোখ বোলাই। স্পিড বেড়ে গেলে ব্রেক কষি, যাতে স্টক বেশিদিন থাকে। অফিস থেকে ফেরার পর আর ল্যাপটপ খুলি না। ইউটিউব দেখি না। বই পড়ি। এ আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। ইউটিউবকে হারানো ইংরিজি বইয়ের কম্ম নয়। যদি কেউ পারে তো বাংলাই পারবে। 

এবার সেই সব বাংলা বইয়ের মধ্যে থেকে দুটো বইয়ের কথা আপনাদের বলব।

*****


ফের ফেলুদা, আবার ব্যোমকেশ/ প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অঙ্কনশিল্পীঃ অভীক কুমার মৈত্র


সৃষ্টিসুখের এ বছরের বইদের মধ্যে একটি প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'ফের ফেলুদা, আবার ব্যোমকেশ'। প্যাস্টিশ সাহিত্য। অর্থাৎ প্লট আর লেখকই শুধু নতুন, চরিত্র আর লেখনশৈলী সেই এক। 

আমার পার্শিয়ালিটি অবান্তরে আর লুকোনোর কিছু নেই, তাই ফেলুদার গল্প ‘রাজধানীতে তুলকালাম’ দিয়েই শুরু করছি। জয়পুরের মহারাজের কালেকশনের “স্টার আইটেম” সোনার টিয়ার চোখে রুবি, গায়ে পান্নাসবুজ এনামেলের কাজ। সে টিয়া চুরি গেছে। আর রহস্যে জড়িয়ে পড়েছে ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ু। সিধুজ্যাঠার এ গল্পে একটা জোরদার ভূমিকা আছে, অন্য ফেলুদার গল্পে যেমন থাকে তার থেকে বেশি। ইন ফ্যাক্ট, কৈলাসে কেলেংকারি ছাড়া আর কোনও গল্পে সিধুজ্যাঠার এরকম পিভটাল ভূমিকা আমি দেখেছি কিনা মনে করতে পারছি না। গল্পের অন্যান্য চরিত্ররা হচ্ছেন পবনদেও জয়সওয়াল, মাধবরাও যোশী, অনুকূল ভদ্র। রহস্য সমাধানের কাজে ফেলুদাকে দিল্লি আসতে হয় এবং দিল্লির বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়। 

ব্যোমকেশের গল্পের নাম ‘গরল তমসা’। গভীর রাতে দেহোপজীবিনীদের একের পর এক নৃশংস খুনের সমাধানে নামে ব্যোমকেশ আর অজিত। এ গল্পের অন্যান্য চরিত্র পুলিশ বীরেনবাবু, পুঁটিরাম, বাঁটুল সর্দার, সুবিমল সান্যাল, তস্য পুত্র অমিয় সান্যাল, তস্য বন্ধু দেবদত্ত সাধুখান। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কলকাতায় জাপানী বোমার ভয়। 

বইখানা পড়তে গেলেই চোখে পড়বে বাঁধাইয়ের অভিনবত্ব। ফেলুদার গল্প বইয়ের একদিকে আর ব্যোমকেশের গল্প বইয়ের অন্যদিকে উল্টো ছাপা। মানে বইখানা ধরে পাতা উল্টে গেলে মনে হবে অর্ধেক গল্প উল্টো করে ছাপা হয়েছে কিন্তু তা নয়, আসলে বইটার দ্বিতীয় গল্পটা পড়তে হবে উল্টো করে ধরে।

এবার আমার মতামত। প্রথমেই প্রবীরেন্দ্রদার সাহসকে স্যালুট জানাই। আমার ফেলুদার প্লটটা একটু জটিল লেগেছে, মানে জয়সওয়াল, যোশী, ভদ্র এ সব একটু গুলিয়ে যাচ্ছিল, তবে আমি একটু বেশি গোগ্রাসে পড়ছিলাম কাজেই দোষ আমার হতে পারে। ব্যোমকেশের গল্পটি ভালো। 

তবে প্যাস্টিশে গল্প কেমন হয়েছের থেকেও জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে নকলটা ভালো হয়েছে কি না। কতটা সত্যজিৎ আর কতটা শরদিন্দুর মতো হয়েছে। চরিত্রগুলোকে ফেলুদা আর ব্যোমকেশ বলে চেনা যাচ্ছে কি না। চরিত্রদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক আগের মতোই ফুটেছে কি না। 

আমার মতে দুটো গল্পেই সেটা চমৎকার ফুটেছে। ফেলুদার গল্পের ঝাড়া হাতপা ভঙ্গিটাও আছে, ব্যোমকেশের বাঙালিয়ানা মাখানো বৈঠকী ভাবটাও আছে। আমার চেনাআধচেনারা কেউ বলেছেন শরদিন্দুর নকলটা সত্যজিতের থেকে বেটার হয়েছে, কেউ সম্পূর্ণ উল্টো। আমার মতে দুটোই খুব ভালো হয়েছে, সত্যজিতের নকলটা একটু বেশি ভালো হয়েছে। অর্চিষ্মানের মতও তাই। 

খুঁত না ধরলে লোকে চেনা বলে একচোখোমির দোষ ধরবে তাই ধরছি। প্যাস্টিশের যে রিস্কটা থাকে, প্রবীরেন্দ্রদার দুটো গল্পেই সেটা অল্পস্বল্প হয়েছে বলে আমার ধারণা। সে রিস্কটা হচ্ছে নকল আসলের থেকে বেশি আসলের মতো হয়ে যাওয়ার। ফেলুদার যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে, যে ম্যানারিজমগুলো, ফেলুদা-তোপসে-জটায়ু ব্যোমকেশ- অজিত-পুঁটিরাম ইত্যাদি সম্পর্কের টানাপোড়েন চাপানউতোর, সেটা তো একটাদুটো গল্পে হয়নি, একটা গোটা সিরিজ ধরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্যাস্টিশ লেখার সময় সে সব বৈশিষ্ট্যগুলোই হয়তো লেখক একইসঙ্গে গুঁজে দিতে চান, তাই ওভারডোজ হওয়ার চান্স থাকে। আমার মতে এদুটো গল্পেও তাই হয়েছে। 

আর যেটা প্রায় সকলের চোখেই পড়েছে, কারণ সেটা চোখে না পড়া একেবারেই অসম্ভব, সেটা হচ্ছে ব্যোমকেশের গল্পে ভাষার গুরুচণ্ডালী। এটা আমার খুবই রহস্যজনক লেগেছে। ইন ফ্যাক্ট এতই রহস্যজনক যে আমি সিরিয়াসলি ভাবছিলাম ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত কি না। হয়তো শরদিন্দুও এরকমই গুরুচণ্ডালী লিখতেন, আমারই চোখে পড়েনি।   

আর খুব ভালো লেগেছে ব্যোমকেশের ছবি আঁকার নেপথ্যের প্রস্তুতি নিয়ে বইয়ের অঙ্কনশিল্পী অভীক কুমার মৈত্রর লেখা। ছবির মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গতের গল্প জানতে পারা সবসময়েই লাভের।



*****

তুতুল/ মহাশ্বেতা দেবী


মহাশ্বেতা দেবীর বাবার নাম তুতুল। বাইরের লোকে তাঁকে চিনত মনীশ ঘটক নামে, কিন্তু মহাশ্বেতা দেবী বাবাকে চিনতেন তুতুল নামে তাই আমরাও তাঁকে তুতুল বলেই ডাকব। মহাশ্বেতা দেবী ভূমিকায় জানিয়েছেন চেনাশোনা অনেকেই তাঁকে তুতুলের গল্প লিখতে বলে গেছেন। কেন বলেছেন সেটা গল্পগুলো পড়লে বোঝা যায়। তুতুল সাধারণ বাবা তো ছিলেন না, সাধারণ মানুষও ছিলেন না। সে অবশ্য সাধারণ ও বাড়ির কেউই ছিলেন না। ঠাকুর আর রায়(চৌধুরী)-এর পর এই ঘটক পরিবার, যার সব সদস্যই প্রায় সেলিব্রিটি।  

মহাশ্বেতা দেবী চমৎকার ভাষায় তাঁর অসাধারণ তুতুলের গল্প লিখেছেন, আরাম করে পড়ার জন্য এ বইয়ের জুড়ি নেই। তাছাড়া ঘটক পরিবারের অন্যান্য সেলিব্রিটি সদস্যদেরও গল্প শোনা যায়, সেটা ফাউ।

কিন্তু সব সেলিব্রিটি আর তুতুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে যে তার নাম ন্যাদোশ। ন্যাদোশ মহাশ্বেতা দেবীদের বাড়ির পোষা গরু। সে খটখট করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠে এবং নামে, নীল দেওয়া জামা, ব্র্যান্ডি চোবানো খড় আর ইলিশের ঝোল খায়। বাংলা সাহিত্যে (যদিও কাল্পনিক নয়, ন্যাদোশ রীতিমত রক্তমাংসের) ন্যাদোশের মতো গরু আর দু’টি নেই, এ আমি মোটামুটি বাজি রেখে বলতে পারি। মহাশ্বেতা দেবীর অনন্যসাধারণ তুতুলের জন্য তো বটেই, অভূতপূর্ব ন্যাদোশের জন্যও, বইটা যদি হাতের কাছে পান পড়ে ফেলবেন।


March 20, 2017

নিষিদ্ধ নগরী





তিয়েনামেন স্কোয়্যার ইস্ট ষ্টেশনে নেমে এদিকওদিক দাঁড়িয়ে থাকা উর্দিদের সামনে গিয়ে “গুগং” বলতে তারা সাদা গ্লাভস পরা আঙুল উঁচিয়ে যেদিকটা দেখিয়ে দিল এসক্যালেটর চেপে সেদিকে বেরিয়ে দেখি কাতারে কাতারে লোক। কথাটা সত্যি তাহলে। হোটেলের দরজায় একজন সহায়ক উর্দি দাঁড়িয়ে থাকেন। ভয়ানক বন্ধুত্বপূর্ণ। আমি গুগং যেতে চাই শুনে ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন, "আজ যাবে? আজ তো ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেষ দিন, ওদিকটাতে মারাত্মক ভিড়। সব রাস্তাঘাট বন্ধ। আরও তো তিনদিন আছ, তখন যেও’খন।"

পরের তিনদিন আমার যে কী হবে সেটা ভাবতেও আমার হৃৎকম্প হচ্ছিল তাই সেদিনই গেলাম। গিয়ে দেখি ওই ভিড়। ফুটপাথে সারি সারি গাছের গোড়ায় বাঁধানো বেদী, তারই একটার ওপর চড়ে আরেকজন উর্দি মুখে চোঙা লাগিয়ে মাতৃভাষায় কী সব বলছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করলাম যে লাইনে দাঁড়ালে কতক্ষণ লাগবে। তিনি দু’টো আঙুল তুলে দেখালেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি দু’ঘণ্টা না দু’দিন, এমন সময় পাশ থেকে একজন বলল, “মে আই হেল্প ইউ?”

প্রশ্নকর্তার নাম শি ল। কাজের সুবিধের জন্য শি ল নিজের নাম বদলে টম রেখে নিয়েছে। শি ল জানাল আমি যদি ওকে গাইড হিসেবে নিয়োগ করি তাহলে ও আমাকে লাইন এড়িয়ে সিক্রেট রাস্তা দিয়ে নিষিদ্ধ নগরীতে ঢুকতে সাহায্য করবে, দু’ঘণ্টা আমার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে নগরীর ইতিহাসভূগোলবিজ্ঞান সব বুঝিয়ে দেবে। পরিবর্তে ও নেবে মাত্র _ ইউয়ান। আমাকে সবাই বলে দিয়েছিলেন চিনের সিস্টেম অনেকটা আমাদের হাতিবাগানের সঙ্গে মেলে। অর্থাৎ যে যা দাম বলবে, আমি ঠিক অর্ধেক দাম থেকে দরাদরি শুরু করব। 

অর্ধেক দাম বলার সাহস আমার হাতিবাগানেই হয় না, চিন তো দূর অস্ত। বুক বেঁধে একটা অংক বললাম, তাতে শি ল হাসল। বলল ও নাকি আমাকে যথেষ্ট কমসম করেই বলেছে। কারণ আমি অ্যামেরিকান নই। অ্যামেরিকান হলে ওর পারিশ্রমিক হয়ে যেত আমার কাছে যা চেয়েছে তার দ্বিগুণ।

অ্যামেরিকান না হওয়ার এতদিনে একটা সুবিধে পাওয়া গেল ভেবে আমি রাজি হয়ে গেলাম। শি ল আমাকে মিনিট সাতেক হাঁটিয়ে একটা খাঁ খাঁ দরজা দিয়ে নিষিদ্ধ নগরীর ভেতর ঢুকিয়ে দিল। তারপর দৌড়ে গিয়ে নিজেই আমার জন্য টিকিট কিনে আনল। তারপর আমরা সিকিউরিটি পেরিয়ে নগরীর মূল অংশে ঢুকে পড়লাম। সিকিউরিটির খুব কড়াকড়ি দেখলাম। ব্যাগ তো চেক করলই, থাবড়ে থাবড়ে সারা গা ভালো করে পরীক্ষা করল। শি ল বলল, "ওরা কী খুঁজছে বল তো?" আমি বোকার মতো বললাম, "বন্দুক? নাকি বোমা?" শি ল বলল, "উঁহু, ওরা দেখছে তুমি লাইটার কিংবা দেশলাই নিয়ে ঢুকছ কি না।"

*****


চোদ্দশো ছয় থেকে উনিশশো কুড়ি, মিং আর চিং রাজাদের মিলিত শাসনকালের পাঁচশো বছরে এই প্রাসাদ যতবার ধ্বংস হয়েছে, তার অধিকাংশই অগ্নিকাণ্ডে। কারণ প্রাসাদের খানিকটা মার্বেল আর খানিকটা পোড়ানো ইট দিয়ে তৈরি হলেও একটা বিরাট অংশ কাঠের। দক্ষিণ পূর্ব চিনের জঙ্গলে প্রায় তিরিশ ফুট উঁচু উঁচু এক বিশেষ গাছের গোটা গোটা গুঁড়ি এনে বানানো হয়েছিল প্রাসাদের থাম। কাঠের ওপর আরও কী কী সব জিনিস, একেবারে শেষে লাল রঙের লাক্ষার পরত। কাঠের বলেই এদের আগুনের ভয় চিরদিনের। বাহাত্তর হেক্টরের (অনেকে বলেন এই নিষিদ্ধ নগরীই পৃথিবীর সবথেকে বড় প্রাসাদ) প্রাসাদ জুড়ে ছড়িয়েছিটিয়ে রাখা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সোনালি গামলায় জল ভরা, আগুন লাগলে যাতে নেভানো যায়। গামলার গায়ের সোনারং এখনও দেখা যায়। সে দেখে আপনি যদি গামলাকে সোনার ভেবে বসেন তাহলে দুঃখ পাবেন না, মনে মনে সান্ত্বনা পান এই ভেবে যে সম্রাটও সেই একই ভুল করেছিলেন। সম্রাটের ভুল করার অবশ্য কারণও ছিল। তিনি সোনার গামলার অর্ডারই দিয়েছিলেন।

কোনও মানে হয়? প্রাসাদের গায়ে সোনার ড্র্যাগন আঁকার তবু না হয় একটা মানে বার করলেও করা যেতে পারে, ও রকম রাজকীয় একখানা প্রাণী বলে কথা, কিন্তু তার গায়ে আগুন লাগলে সোনার গামলা থেকে জল ঢালাটা সিম্পলি বাড়াবাড়ি। আমার তো তাই মনে হয়। আমি জানি আপনাদেরও মনে হচ্ছে। যে কোনও সুস্থ লোকেরই মনে হবে। কারিগরও আপাদমস্তক সুস্থ মানুষ, খেটেখুটে খায়, তারও এক্স্যাক্টলি এই কথাটাই মনে হল। রাজবাড়ি থেকে অর্ডার নিয়ে ফেরার পথে যতই ভাবল ততই সোনার গামলার কুযুক্তিটা তার কাছে প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। তারপর বাড়ি ফিরে চ্যালাচামুণ্ডা নিয়ে কারিগর যখন সত্যি সত্যি গামলা বানাতে শুরু করল ততক্ষণে রাজা সম্পূর্ণ আউট অফ সাইট, আর সেই সঙ্গে মাইন্ড থেকে ভয়ও উধাও। কারিগর সবক’টা গামলা বানালো তামা আর লোহা দিয়ে, ইতি গজ-র মতো করে কেজি আড়াই সোনা তার সঙ্গে মিশিয়ে দিল। রাজা ধরতেই পারলেন না। রাজা হয়তো ততদিনে গামলার কথা ভুলেই মেরে দিয়েছেন, হয়তো তিনি তখন সাত হাজার পানের পিকদানির অর্ডার দিচ্ছেন, খাঁটি হাতির দাঁতের।

অনেকদিন পর সোনার দর যখন বেড়ে গেছে অনেক সম্রাটের আমলের তুলনায়, তখন কিছু বুদ্ধিমান লোক, ছুরি দিয়ে চেঁছে চেঁছে যতখানি পেরেছিল সোনা তুলে নিয়ে গিয়েছিল গামলার গা থেকে।

 *****


আরেক সম্রাটের নাকি সম্রাজ্ঞী ছিল একজন, আর রক্ষিতা ছিল তিন হাজার। 

শি ল বলল, "ভাবতে পার?"

আমি ঘাড় নাড়লাম। তিন হাজারের যুক্তিটা আমার মাথায় ঢোকেনি। স্মৃতিশক্তি যদি মারাত্মক ভালোও হয় তবুও তো পাঁচশো জনের পর সবার নাকচোখমুখহাত সব অবিকল একইরকম লাগবে। তাহলে অতগুলো মানুষকে বসিয়ে খাওয়ানোর মানে কী? ভারি অদ্ভুত। 

শি ল বলল, "না না আমি সে অদ্ভুতের কথা বলছি না। আমি তোমাকে অবাক হতে বলছি অন্য একটা কথা ভেবে। সম্রাটের তো কাজকর্ম ছিল, বসে বসে রক্ষিতাদের সঙ্গে সময় কাটালে তো চলত না। দেশ চালাতে হত। তাহলে এত রক্ষিতা সম্রাট জোগাড় করলেন কীভাবে, তাঁর নিজের তো সময় ছিল না।"

আমি বললাম, "সত্যি, কী করে করলেন?" 

শি ল ভুরু নাচিয়ে বলল, "অ্যাডভাইসর ছিল। রক্ষিতা নির্বাচনের। সুপ্রিম হারমনি প্রাসাদের সামনের মাঠে রক্ষিতা নির্বাচনের কমপিটিশন হত। হাজার হাজার মেয়ে। অ্যাডভাইসররা ভিড়ের মধ্যে থেকে সর্বলক্ষণযুক্ত মেয়ে বেছে রাজার হারেমের জন্য নির্বাচন করতেন।"

চমৎকার ব্যবস্থা, মানতেই হবে। শি ল বলল, "কিন্তু সব অ্যাডভাইসররা তো ধোয়া তুলসিপাতা হয় না। বিশেষ করে এক চিং রাজার সময় নাকি রাজার রক্ষিতা-অ্যাডভাইসর মাঞ্চুরিয়ান ছিলেন, তাই তিনি বা তাঁরা হারেমে কেবল মাঞ্চুরিয়ান মেয়েদেরই সিলেক্ট করতেন। আর তারা সকলেই খেঁদিপেঁচি হত।" আমি বললাম, "কেন মাঞ্চুরিয়ান মেয়েদের মধ্যে সুন্দরী ছিল না বুঝি?" তখন শি ল হেসে বলল, "অ্যাডভাইসর পাজি হলে কী হবে, তাঁর মাথায় বুদ্ধি ছিল। একগাদা খেঁদিপেঁচির মধ্যে একজন সুন্দরীকে ঢোকালে যা মারামারি বাধবে, সে সামলাবে কে? রাজার তো সময় নেই, তাঁকে তো আফটার অল দেশ চালাতে হবে।" 

******


আরেকজন সম্রাট খুব খেতে পারতেন। চারটে শুয়োর, চল্লিশটা পাঁঠা, চারশোটা মুরগি ইত্যাদিপ্রভৃতি। তবে আমার মতো রাজার সর্বক্ষণ মুখ চলত না, তিনি খেতেন দিনে মোটে দু’বার। সকাল সাতটা থেকে ন’টার মধ্যে একবার, আবার বিকেলে আরেকবার। রাতে খিদে পেলে ফলটল দুধটুধ দিয়ে চালিয়ে নিতেন। রোজ তাঁর জন্য দু’শো পদ রান্না হত। সকালে দু’শো, বিকেলে দু’শো। শত শত শেফ ছিল, তারা পালা করে রাঁধত, পাছে এক হাতের স্বাদ রাজার মুখ মেরে দেয়। রান্না হওয়ার পর রুপোর ছুঁচ খাবারে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হত, বিষ থাকলে রং বদলাবে। 

*****

আরেকজন সম্রাট ছিলেন অল্পবয়সী। তাঁর মন্ত্রী তাঁর ওপর খুব ছড়ি ঘোরাতেন। বলতেন, "তোমাকে কিছু করতে হবে না, তুমি তো অপদার্থ, তুমি বসে থাক, সাম্রাজ্য আমি চালাচ্ছি।" সেনাবাহিনী মন্ত্রীর কবজায় ছিল তাই তরুণ সম্রাট বেশি ট্যাঁ ফো করতে পারতেন না। বাচ্চা হলেও সম্রাটের মাথায় বুদ্ধি ছিল। একটা জিনিস তিনি ওই অল্পবয়সেই বুঝেছিলেন, আপনাকে কে কী ভাবল সেটা যে ভাবছে তার সমস্যা। আপনার নয়। কেউ যদি আপনাকে বোকা বা দুর্বল ভাবে, ভেবে আনন্দ পায়, তাহলে লাফিয়েঝাঁপিয়ে সে ভাবনাটাকে সংশোধন করার দরকার নেই। বরং সেটাই ভেবে যেতে দিলে সুবিধে আছে। আমাদের তরুণ সম্রাটও তাই করলেন। মদেমোচ্ছবে ডুবে থাকার ভঙ্গি করতে লাগলেন। আর একটা হবি তাঁর ছিল, ন্যাওটা কিছু ছেলেপুলে নিয়ে কুস্তির আসর জমানো। মন্ত্রী নিজে পালোয়ান ছিলেন, তিনি রাজার খেয়াল দেখে হাসতেন। রাজা বলতেন, "আরে ওরা পোলাপান, আপনার নখের ময়লার যুগ্যি নয়, ছাড়ান দেন।" 

তারপর একদিন সম্রাট মন্ত্রীকে নেমন্তন্ন করলেন। তাঁর পোলাপানের খেলাখেলা কুস্তির আসর দেখে যাওয়ার জন্য, আর যদি রুচিতে কুলোয়, তাহলে দু’চারটে টিপসও দেবেন, পোলাপান বর্তে যাবে। মন্ত্রী এলেন। সম্রাটের ছেলেরা লেংটি পরে গায়ে তেল মেখে চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে। মন্ত্রী মুখোমুখি বসেছেন, চা খাওয়া চলছে, জুঁইফুলের সুবাস ভুরভুর করে ঘর ছেয়ে ফেলেছে, এমন সময় কী একটা কথা বলতে গিয়ে রাজার হাত থেকে ফাইন চায়নার কাপ হাত কেঁপে মাটিতে পড়ে গেল। মন্ত্রী রিফ্লেক্সে কাপ সামলাতে নিচু হলেন, আর অমনি চ্যালারা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে বন্দী করে ফেলল। তারপর মন্ত্রী জেলে, রাজা সিংহাসনে। 

*****


নগরীর প্রধান তিনটে হল দেখলাম, হল অফ সুপ্রিম হারমনি, হল অফ সেন্ট্রাল হারমনি আর হল অফ প্রিসার্ভিং হারমনি, তিনটেতেই চকচকে বাহারি মাথায় ছাতা ধরা তিনটে সিংহাসন রাখা। সবাই পদমর্যাদায় সমান নয়। সবথেকে সেরা আর উঁচু সিংহাসনটা রাখা আছে হল অফ সুপ্রিম হারমনিতে। তার মাথার ওপর ঝুলে আছে বাজখাঁই লোহার বল আর সেই বলের ওপর দাঁত খিঁচিয়ে বসে আছে একখানা ড্রাগন, ঠিক যেন মাইলি সাইরাস। সিংহাসনের অধিকারী নয় এমন কেউ সিংহাসনে বসলেই ড্রাগনের হাত খসে ওই রেকিং বল সে দুরাচারীর মাথায় পাকা তালের মতো খসে পড়বে। (ওপরের ছবিটা সে সিংহাসনের নয়। অন্য সিংহাসনের।)

আপাদমস্তক সোনায় মোড়া জমকালো সেই সিংহাসনে মিং চিং সকলেই চড়েছেন। মাঝখানে নাকি এক ওয়ারলর্ড এসেছিলেন, মোটে একশো দিনের জন্য, তাঁর এই সিংহাসন পছন্দ হয়নি। সত্যি বলতে কি ব্যাপারটা পছন্দ হওয়ার মতোও নয়। বিদঘুটে সোনালি রং, তারপর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে অতখানি ওঠা, অ্যাক্রোফোবিয়া থাকলে কেলেংকারি, কানে খাটো হলে নিচে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীসান্ত্রী কে কী বলছেন কিছুই বোঝা যাবে না। তার ওপর মাথার ওপর ওই হাঁ করা ড্র্যাগন আর লোহার বল। ওয়ারলর্ড সিংহাসন হঠিয়ে নিজের জন্য মিনিম্যালিস্টিক সোফার অর্ডার দিলেন। দুঃখের বিষয়, একশো দিন পরেই তিনি সোফাচ্যুত হলেন। পরের রাজা এসে আবার সিংহাসন খুঁজে বার করে তাতে চড়লেন।

সিংহাসন খুঁজে বার করা অবশ্য সহজে হয়নি। কারণ প্রাসাদে ঘর একটাদুটো ছিল না।  

নিষিদ্ধ নগরীতে মোট ক'খানা ঘর ছিল? বোরিং হিসেবে বলে ন'হাজার ন'শো নিরানব্বইটা। আর ইন্টারেস্টিং হিসেবে বলে, প্রাসাদের কোনও ঘরে এক নবজাতক জন্মালে তাকে প্রতি রাতে যদি এক এক ঘরে ঘুমোতে দেওয়া হয়, তবে সবক’টা ঘরে ঘুমোনোর পালা শেষ হতে হতে সে নবজাতক সাতাশ বছরের যুবক হয়ে যাবে।

*****
এ সব সত্যি? 

মিথ্যে কী করে বলি রুকুবাবু? শি ল গাইড যে এ সব বলে গেছেন। এখন শি ল-কে বিশ্বাস করা কতখানি সমীচীন সে আমি জানি না। এ সব গল্পের কোনও প্রমাণ আমার কাছে নেই। এ সব সম্রাটদের কে মিং বংশের, কে চিং বংশের, তামার গামলায় সত্যি সত্যি আড়াই কেজি সোনা ছিল কি না, রাজার তিন হাজার রক্ষিতা ছিল কি না, নাকি আড়াই হাজারকে বদলোকে বাড়িয়েচাড়িয়ে তিন হাজার করে বাজারে ছেড়েছে, সে সব আমি জানি না। গুগল করে সন্দেহভঞ্জনের চেষ্টা করতে পারতাম, করিনি। কারণ ঠিকভুল ধরা আমার কম্ম নয়, আর সত্যি বলতে কি ধরে হবেই বা কী? সত্যি হলেও গল্পগুলো ভালো, মিথ্যে হলেও ভালো। ভুলে যাওয়ার আগে সে গল্প আপনাদের শুনিয়ে দিলাম। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল, আপনাদের কেমন লাগল জানাবেন।





March 13, 2017

ছুটির নোটিস



আশা করি দোল আপনারা যে যেমন চেয়েছেন তেমন করে কাটাতে পেরেছেন। জোর করে কেউ আপনাদের রং দেয়নি, যাদের সঙ্গে খেলতে চেয়েছেন তারা সানন্দে এবং সোৎসাহে আপনাদের সঙ্গে দোল খেলেছে। আমিও এ বছর দোলে খুব মজা করেছি। তিনদিনের ছুটিতে তেড়ে ঘুমিয়েছি, পাস্তা রেঁধেছি বেড়েছি খেয়েছি, পুরোনো এয়ার কুলার অবশেষে ও এল এক্স-এ বেচে হালকা হয়েছি এবং 'ষড়রিপু' নামের একটি চিত্তচমৎকারী বাংলা থ্রিলার দেখেছি।

কিন্তু সুখের দিন শেষ, এবার আমাকে পেটের দায়ে একটু ভাগলবা হতে হচ্ছে। সামনের সাতদিন অবান্তর বন্ধ থাকবে। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন। খুব আরাম করবেন। সোম-মঙ্গলবার নাগাদ আবার আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। ততদিনের জন্য টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।


March 12, 2017

সোনা ঘুমোলো



কাল মা ফোন করেছিলেন রাত আটটা বাহান্নয়। মোবাইল হয়ে এই ঝামেলা হয়েছে, সময়ের ব্যাপারে আর গাছাড়া হওয়ার জো নেই। মা রাত ন’টা নাগাদ ফোন করেছিলেন বলতে পারতাম, কিন্তু ফোনের লগবুকে জ্বলজ্বল করছে, ‘মা’ মিসড কল, আটটা বাহান্ন।

আজ সকাল ছ’টা তেরোয় মা’কে ফোন করে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “মা তুমি কাল আটটা বাহান্নয় ফোন করেছিলে দেখলাম?"

মা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “আমি করতে চাইনি সোনা, বিশ্বাস কর। টিভিতে বলল দিল্লিতে ঝড়বৃষ্টির হচ্ছে, টেম্পারেচার কমবে। তাই ফোন করে মনে করাতে গেছিলাম যে যদি ঠাণ্ডা লাগে, তবে সোয়েটারগুলো বার করে যেন পরিস, কুঁড়েমো করে ঠাণ্ডায় কাঁপিস না। জানতাম দেরি হয়ে গেছে, তবু দেখলাম ন’টা তখনও বাজেনি, তাই একবার চান্স নিলাম আরকি, তিনখানা কল হতেই বুঝতে পেরে কেটে দিয়েছি। সরি সোনা, রাগ করলি সোনা?”

ইমেজ এমন খারাপ হয়েছে, সেদিন প’নে সাতটা নাগাদ অফিস থেকে ফেরার পথে ট্যাক্সিতে বসে আছি, ফোন বাজল, হ্যালো বললাম, ওপার থেকে একজন জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কথা বলা যাবে কি না। নাকি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।  

সাতটা-টা বাড়াবাড়ি, তবে সাড়ে আটটার মধ্যে মোটামুটি আমার দিন শেষ হয়। দাঁত মেজে, ফোন চার্জে বসিয়ে, একখানা বই হাতে নিয়ে আমি আমার বিছানার সাইডে সেঁধিয়ে যাই, তারপর ঘুম আসার সাধনা। সেটা সাড়ে ন’টা পর্যন্তও চলতে পারে, আবার আটটা বাহান্নতেই সিদ্ধিলাভ হতে পারে, কাল যেমন হয়েছিল। 

আত্মপক্ষ সমর্থনে আমার একটাই কথা বলার। আমি তাড়াতাড়ি ঘুমোই, কিন্তু বেশি ঘুমোই না, উঠিও সকাল সকাল। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও দরকার ছিল না যদিও। বেশি ঘুমোলেই বা কী? তবু বললাম, কারণ ঘুমোনো নিয়ে অ্যাপোলোজেটিক হওয়াটা আমাদের স্বভাব। যারা বেশি ঘুমোয় তারা সব কুঁড়ের বাদশা, আর যারা কম ঘুমোয় তাঁরা কর্মবীর, এ ধরণের একটা সমীকরণ চালু আছে বাজারে। আমার গানের মাস্টারমশাই, আমার যখন বছর দশেক বয়স, আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে দিনে যদি একজন লোক আটঘণ্টা করে ঘুমোয় তাহলে ষাট বছর বাঁচলে সে আসলে তার গোটা জীবনের কুড়ি বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেবে। অর্থাৎ, আমরা সবাই একেকজন চলন্তফিরন্ত রিপ ভ্যান উইংকল। 

কুড়ি বছর যদি ঘুমোবে তাহলে কাজটা করবে কখন? কাজেই কাজের লোকেরা ঘুমোন না। একজায়গায় পড়েছিলাম, অমিতাভ বচ্চন আর আবদুল কালাম, দিনে মোটে পাঁচঘণ্টা করে ঘুমোন এবং ঘুমোতেন। “দুপুরে ঘুমোস?” প্রশ্নটা আপাত নিরীহ, কিন্তু এর মধ্যে যে কতখানি জাজমেন্ট পোরা থাকে, সেটা প্রশ্নটার মুখোমুখি যারা না হয়েছে জানবে না। আমাকে এ প্রশ্নটা করলে আমি চোখ কপালে তুলি। “পাগল? আমি ঘুমোবো দুপুরবেলায়?” বলে অর্চিষ্মানের দিকে দেখাই। শনিরবি ও মাঝে মাঝে লম্বা হয়, আমি ঘুমোই না। আমি না ঘুমিয়ে ‘স্ক্রাবি ডাবি’ খেলি।

সেদিন একটা আর্টিকলে পড়ছিলাম জাপানিরা নাকি না ঘুমোনোটাকে একটা গর্বের ব্যাপার বলে মনে করেন। মানে “বাঙালিরা সংস্কৃতিবান”, “অ্যামেরিকানরা কাজ করে”র মতো “জাপানিরা ঘুমোয় না” একটা পজিটিভ স্টিরিওটাইপ, যেটা ওঁরা পছন্দ করেন। অফ কোর্স, না ঘুমোনো তো আক্ষরিক অর্থে সম্ভব নয়, তবে ওঁদের গড় ঘুমের স্টাইলটা বাকি পৃথিবীর থেকে আলাদা। একবারে গাদাখানেক না ঘুমিয়ে ওঁরা খেপে খেপে ঘুমিয়ে নেন। ট্রেনে, বাসে, ওভারব্রিজের সিঁড়ির কোণে বসে। “ন্যাপ”ওয়ালারা এই ধরণের ঘুমের ইংরিজি প্রতিশব্দ না পেয়ে মাথা চুলকোচ্ছিলেন, আমি কিন্তু জানি বাংলায় এ ঘুমের একটা পারফেক্ট নাম আছে। ঝিমটি। সব লোকাল ট্রেনের যাত্রীরাই এই ঝিমটি ঘুমে দক্ষ হন। 

অনেকে রোজ রাতে টানা আটঘণ্টা ঘুমোয়, অনেকে খেপে খেপে ঘুমোয়। মধ্যাহ্নভোজনের পর মিনিট কুড়ির ‘পাওয়ার ন্যাপ’ শুনেছি প্রোডাক্টিভিটিতে বিপ্লব এনে দিতে পারে। অনেকে পাশের ঘরে ফিসফিস হলেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না। অনেকে বজ্রপাতের মতো নাকডাকের মধ্যে নিশ্চিন্তে ঘুমোয়।  অনেকে ফটফটে আলোর সমুদ্রে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, অনেকে ঘর ঘুরঘুটি না হলে ঘুমোতে পারে না। জীবনের কোনও একটা সময় হোস্টেলে থাকলে এসব প্যাকনা কমে আসা উচিত বলেই আমার ধারণা। কোনও এক অদ্ভুত লটারিতে রুমমেট সবসময় এমন দু’জন মানুষই হয় যাদের পড়া, প্রেম এবং ঘুমের স্টাইল একেবারে নর্থ পোল সাউথ পোল। আমার রুমমেট ঘুমোতে যেত ভোর চারটেয়। আমি ঘুম থেকে ওঠার পর। 

ঘুম নিয়ে যত মত আছে পৃথিবীতে, তত আর কিছু নিয়েই নেই। এই পোস্টটা লিখতে বসে দেখতে গেলাম বড় বড় লোকেরা ঘুম নিয়ে কে কী বলেছেন। গান্ধীজী বলেছিলেন ঘুম আসলে মৃত্যু। ছোটবেলায় আরেকজন গান্ধীবাদীর সঙ্গে পরিচয় ছিল, তিনিও ঘুম সম্পর্কে প্রায় একই রকম মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি বলেছিলেন, একমাত্র মানুষ ছাড়া নাকি আর কোনও প্রাণীর শিরদাঁড়া সোজা নয়। আর মানুষ যখন ঘুমোয় তখন তার শিরদাঁড়া সোজা থাকে না। অর্থাৎ, ঘুমন্ত মানুষ মনুষ্যেতর। 

গান্ধীবাদে আমার আপত্তি নেই, অন্য অনেক বাদের থেকে ওই বাদটিকেই বরং আমার বেশি সুবিধেজনক লাগে, কিন্তু ঘুমের ব্যাপারে আমি মহাত্মার সঙ্গে একমত নই। আমি নিজে মনে করি খাওয়ার থেকে ঘুম বেশি জরুরি। না খেয়ে তবু থাকা যায়, না ঘুমিয়ে থাকা যায় না। আর কাজের কথাও যদি ধরি, তাহলে আমার মতে ওই কুড়ি বছরের ঘুমই বাকি চল্লিশ বছরের কাজের কোয়ালিটি নির্ধারণ করবে। তাছাড়া ঘুমোলে সব দুঃখকষ্ট, জ্বালাযন্ত্রণা থেকে একটা সাময়িক মুক্তি মেলে, আমার মতো ঘোর পলায়নবাদীর যেটা পছন্দের। এ ব্যাপারে আমার দুঃখ হেমিংওয়ে বুঝেছেন। তিনি বলেছেন, I love sleep. My life has the tendency to fall apart when I'm awake, you know?” 

যাই হোক, কথাটা ঘুমের পরিমাণ নিয়ে হচ্ছিল না, হচ্ছিল ঘুমের সময় নিয়ে। পৃথিবীতে দু’রকম লোক থাকে, রাত জাগা আর ভোরে ওঠা। আমি চিরকালই আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ। প্রথম ক’দিন হোস্টেলে গিয়ে সাপের পাঁচ পা দেখে রাত জেগেছিলাম। হোস্টেল ছাড়ার পর আবার যে কে সেই। আবার উল্টোটাও দেখেছি। সারাজীবন হোস্টেলে সাড়ে চারটের সময় ধুতি পরে প্রার্থনায় হাজিরা দিয়েও ভোরে ওঠা মজ্জাগত হয়নি। মাথার ওপর থেকে অনুশাসন সরে যেতেই আবার দুপুর বারোটা পর্যন্ত ভোঁস ভোঁস।। আমার ধারণা, ঘুমটা লোকের একটা খুব গভীর জায়গা। চুলের ছাঁট আর চশমার ফ্রেম যত সহজে বদলানো যায়, ঘুমের প্যাটার্ন বদলানো তত সোজা নয়। 

যে প্রশ্নটা মাথায় আসেই তা হচ্ছে কোনটা ভালো? রাত জাগা না ভোরে ওঠা? মাঝরাতের বৃষ্টির শব্দ, দূর থেকে ভেসে আসা কীর্তনের খোল, শেষ ট্রেনের বাঁশি ভালো, নাকি ভোরের আজান আর পাখির ডাক ভালো? রাতের নৈঃশব্দ্য ভালো না ভোরের শিরশিরানি ভালো? জানালার ফাঁক দিয়ে অন্ধকারে দূরের কোনও বাড়ির একটি জানালার টিমটিমে আলো ভালো, নাকি পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা ভোরের নরম আলো ভালো? 

পপুলার মিডিয়ার ছাঁকনি গলে আসা সায়েন্টিফিক রিসার্চ বিশ্বাস করলে বলতে হয় ভোরে ওঠার দিকেই পাল্লা ঝোঁকা। ‘সেভেন থিংস সাকসেসফুল পিপল ডু’-গোছের লিস্টে ভোরে ওঠাটা মোটামুটি প্রথম তিনে নিয়ম করে থাকে। তবে ও সব কাগুজে কথা। "ভোরে উঠেও ডাহা ফেল" লিস্টের জলজ্যান্ত নমুনা আমার হাতের কাছেই আছে, রোজ ভোরে আয়নায় তার সঙ্গে মোলাকাত হয়, কাজেই ও সব রিসার্চে আমার বিশ্বাস নেই। তার থেকে রক্তমাংসের চেনাজানা মানুষের মতামতের ওপর আমার ভরসা বেশি।

মুশকিলটা হচ্ছে দুটো জিনিসের মধ্যে ভালোমন্দ বাছতে বললেই লোকে সতর্ক হয়ে যায়। "ভালোমন্দ কিছু তো হয় না, দুটোরই পজিটিভ নেগেটিভ আছে," গোছের গা-বাঁচানো উত্তর দিয়ে কাজ সারে। কিন্তু সকলেই মনে মনে জানে কোনটা ভালো। আত্মবিশ্বাসীরা জানে তাদের নিয়মটাই সেরা। আর আমার মতো যাদের হাঁটু সর্বক্ষণ কাঁপে, তারা ভাবে, ইস যদি ওদের মতো হতে পারতাম। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন দিন মানুষের, রাত দেবতার। আমার চেনা একজন, যাকে জীবনের একটা সময়ে আমি প্রায় রবীন্দ্রনাথের মতোই শ্রদ্ধাভক্তি করতাম, তিনি বলেছিলেন, দিনে কাজ করে মুটেমজুররা, রাত জাগে বুদ্ধিজীবীরা। 

আত্মবিশ্বাসের অভাব আর বুদ্ধিজীবী হওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও তাহলে আমি আমার ঘুমের সময় বদলে নিচ্ছি না কেন? এক নম্বর কারণটা আগেই বলেছি। এ জিনিস বদলানোর নয়। রাত জাগা আমার ধাতে নেই, তাই আমি রাত জাগতে পারি না। কিন্তু সে রকম তাগিদ থাকলে ধাতের বিরুদ্ধে যাওয়ার একটা চেষ্টা অন্তত করা যায়, যেটা আমি হোস্টেলে গিয়ে করেছিলাম, এখন আর করি না। কেন করি না সে কথা বলতে গেলে জর্জ বার্নার্ড শ-এর একটা উক্তি মনে করতে হবে। Marriage is an alliance entered into by a man who can't sleep with the window shut, and a woman who can't sleep with the window open. ঘুমের ব্যাপারে আমার আর অর্চিষ্মানের প্রায় সব অভ্যেসই উল্টো, কিন্তু আমাদের সবথেকে বড় অমিল ঘুমের সময়ে। সপ্তাহের মাঝখানে নেহাত পারা যায় না, কিন্তু শনিরবি নিয়ম করে আমি যখন উঠি, তখন ও "গুড নাইট" বলে চোখ বন্ধ করে।

আর এই অমিলটা, আমাদের দুজনের সব অমিলের মধ্যে আমার ফেভারিট। আমার মনে মনে জানি, ওরও। ঘুম এবং জাগরণের এই অসামঞ্জস্য আমাদের দু’জনকেই একটি বিরল এবং মহার্ঘ বিলাসিতার সুযোগ দিয়েছে, তা হল পাশাপাশি থেকেও একলা থাকার। রাতটা ওর অ্যালোন টাইম, সকালটা আমার। বুদ্ধিজীবী না হলেও আমার কষ্টেসৃষ্টে চলে যাবে, কিন্তু রোজ সকালের ওই ক'ঘণ্টা সমস্ত মনুষ্যসঙ্গ বিবর্জিত ক'ঘণ্টার সুখ আমি ছাড়তে পারব না। 


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.