October 15, 2017

এ মাসের বই/সেপ্টেম্বর ২০১৭/২ঃ মিস্ট্রি ও মহাকাব্য



A Rising Man/ Abir Mukherjee


উৎস গুগল ইমেজেস

এ বছরের শুরুতে আমার বই পড়া সংক্রান্ত একটা রেজলিউশন ছিল, ননককেশিয়ান গোয়েন্দার স্টক বাড়ানো। বই পড়া সংক্রান্ত বাকি সব রেজলিউশনের মতো, এটা রক্ষাতেও আমি ডাহা ফেল করতে চলেছি। তবে হারা জেতায় লাজ নেই, যত লাজ নিশ্চেষ্ট হয়ে অদৃষ্টের হাতে সব ছেড়ে বসে থাকায়। সে জন্য হাফ বছর পেরিয়ে যেতে আমি নড়েচড়ে বসলাম। আর অমনি গার্ডিয়ান পত্রিকায় একখানা গোয়েন্দা উপন্যাসের গ্লোয়িং রিভিউ চোখে পড়ল। উপন্যাসটার কথা অনেকদিন ধরেই এদিকওদিক থেকে কানে আসছিল। গার্ডিয়ানের রিভিউ মনে জোর দিল, কিন্ডলে কিনে ফেললাম আবীর মুখার্জির আত্মপ্রকাশকারী উপন্যাস ‘আ রাইজিং ম্যান’। স্যাম উইন্ডহ্যাম সিরিজের প্রথম বই।

এই শেষের তথ্যটা আমি জানতাম না। আমি শুধু জানতাম মুখার্জির উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষের কলকাতা শহরে। সেখানে একজন বাঙালি পুলিসের সাহসিকতার কথাও পড়েছিলাম, পড়ে ধরেই নিয়েছিলাম যে এ গল্পের গোয়েন্দাও কালা আদমি। 

বই কেনার পর দেখি গোয়েন্দা আপাদমস্তক সাহেব, ক্যাপ্টেন স্যাম উইন্ডহ্যাম। গল্পের কালা আদমি সার্জেন্ট ‘সারেন্ডার-নট’ ব্যানার্জি, ক্যাপ্টেন উইন্ডহ্যামের তোপসের ভূমিকায়। 

যাকগে, একটা রেজলিউশন (ননককেশিয়ান গোয়েন্দার বই পড়ার) রাখা হল না, আরেকটা (বই পড়ার) রাখা হল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের আতংক স্বচক্ষে দেখে, স্ত্রীবিয়োগের যন্ত্রণা পেয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা ক্যাপ্টেন উইন্ডহ্যাম এসেছেন কলকাতায় ইম্পিরিয়াল পুলিশবিভাগের গোয়েন্দা হিসেবে যোগ দিতে। নতুন শহরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই একটি ঘনঘোর রহস্যে উইন্ডহ্যামের দায়িত্বে এসে পড়ে। একজন উচ্চপদস্থ ’সাহিব’, নেটিভ আদমিদের পাড়ার গলির নালার মধ্যে খুন হয়ে পড়ে আছেন, মৃতদেহের মুখে কাগজ পোরা, তাতে বাংলায় ভারত ছাড়ার হুমকি লেখা।  

তদন্ত শুরু হল। যা যা গোলমাল বাধার সবই বাধল। উইন্ডহ্যামের সহকারী ডিগবি, ঘোর রেসিস্ট, ঘোর ভারতবিদ্বেষী। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ঘুণধরা ব্রিটিশ রাজ। সরকারি আনুকূল্যপ্রাপ্ত দুর্নীতিগ্রস্ত পাটকলের ফিরিঙ্গি মালিক। বেইমান ভারতীয় খোচর। ‘টেররিস্ট’ স্বাধীনতাসংগ্রামী। কোঠাবাড়ির আবেদনময়ী মালকিন। রহস্যময়ী অ্যাংলোমেম টাইপিস্ট। এই পরিস্থিতিতে স্যাম উইন্ডহ্যামের একমাত্র সঙ্গী অধস্তন পুলিস সার্জেন্ট ব্যানার্জি। যার খটমট নাম জিভে কায়দা করতে না পেরে সাহেবরা ‘সারেন্ডার-নট’ করে নিয়েছে।

আ রাইজিং ম্যান-এর ফরে অনেক কিছুই, চরম ইন্টারেস্টিং প্রেক্ষাপট, সেই প্রেক্ষাপটের সদ্ব্যবহারও করতে ছাড়েননি/ভোলেননি শ্রী মুখার্জি। সে সময়ের কলকাতার বর্ণনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, টেরিটিবাজারে চিনা আফিমের আড্ডা, একই শহরে নেটিভ এবং সাহেবদের পাশাপাশি কিন্তু যোজনদূরত্ব অবস্থান, এ সব কিছুই ছুঁয়ে গিয়েছেন তাঁর গল্পে।

আর সেটা করতে গিয়েই গল্পটার দিকে নজর দেননি। বা আরেকটু ক্রিটিক্যাল হয়ে বলা যায়, উল্টোভাবে বলা যায়, সেটা করেছেন বলেই গল্পের দিকে নজর না দিয়েও পার পেয়ে গেছেন।

রাইজিং ম্যান-এর ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং যতটা টানটান, রহস্য সমাধানের প্রক্রিয়া ততটাই ফুটোফাটা। বা বলা উচিত ফুটোগুলো চাপা দিতে অক্ষম লেখক। গোয়েন্দাগল্প পড়েটড়ে আমার যা মনে হয়েছে, ভুল ধরতে চাইলে সব তদন্তেরই ভুল ধরা যায়। যাকে জেরা করলে সেকেন্ড সিনে খুনি বেরিয়ে যাবে তার জেরা টাঙিয়ে রাখা হয়ে লাস্টের আগের সিন পর্যন্ত। করিৎকর্মা লেখক এইসব ধাপ্পাবাজি সাফল্যের সঙ্গে চাপাচুপি দিয়ে রাখতে পারেন। মাঝখানে রেড হেরিং, ফলস ক্লু দিয়ে পাঠককে এমন গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখেন যে সে অন্য কথা ভাবার সময় পর্যন্ত পায় না। আবীর মুখার্জি সেটা পারেননি। উইন্ডহ্যাম পাগলের মতো দৌড়চ্ছেন এদিকসেদিক, আর আমি ভেবে চলেছি ওই ব্যাপারটার কী হল, ওই লাইন অফ ইনভেস্টিগেশনটা পারসু করল না তো। (মনে রাখতে হবে, আমি কিন্তু অত্যন্ত বিশ্বাসী পাঠক, আমি ভুল পথে ভেসে যেতেই চাই, সেই আমারই যখন এতসব প্রশ্ন মনে জাগছে, সেয়ানা পাঠকদের জাগতে বাধ্য।)

তবে লেখকের এটা প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস, কাজেই গ্রেস দিতে চাইলে দেওয়া যায়। যে বিষয়টায় আমি গ্রেস দিতে পারছি না (নাকি চাইছি না?) সেটার কথা বলে শেষ করি। স্যাম উইন্ডহ্যাম সবে একবেলা হল কলকাতায় এসে নেমেছেন, এর আগে তিনি আধখানা বাঙালিও চোখে দেখেননি, অথচ বাঙালি এবং কলকাতা নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস দেখার মতো। ভারতবর্ষের বাকি প্রদেশের ওপর ব্রিটিশসাম্রাজ্য আরামসে আধিপত্য চালাচ্ছে, কেবল এই বাগ্মী, তেজস্বী এবং মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, বুদ্ধিমান বাঙালির দল তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। আর কলকাতা, আহা। এরকম বর্ণময়, ইউনিক শহর পৃথিবীতে আর দুটি আছে কি না সন্দেহ। এ কি সদ্য প্রিয়বিরহে শোকার্ত, দেশ ছেড়ে আসা সাহেবের জবানবন্দী, নাকি প্রবাসী কলকাতাবাসীর ফেসবুক পোষ্ট, মাঝে মাঝে আমার সত্যি গুলিয়ে যাচ্ছিল। 

*****

Vyasa: The Beginning/ Sibaji Bandyopadhyay and Sankha Banerjee


উৎস গুগল ইমেজেস

২০১৭র সেপ্টেম্বরে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ঘটল, আমি আমার জীবনের প্রথম গ্রাফিক নভেলটা পড়লাম। তাও আবার যে সে নভেল না, একেবারে মহাভারত। শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আর শঙ্খ ব্যানার্জির ছবিতে মহাভারতের শুরুর দিকের অংশ নিয়ে গ্রাফিক নভেল বার করেছে পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস, নাম দিয়েছে ব্যাসঃ দ্য বিগিনিং, দাম করেছে চারশো টাকা। দামটা আমার মতে খুবই ন্যায্য, কারণ মোটা বই, মোটা পাতা, ঝকঝকে বাঁধাই।

ব্যাস দি বিগিনিং-এর বেশিরভাগ গল্প -  সত্যবতী পরাশর, সত্যবতী শান্তনু, ভীষ্মের শপথগ্রহণ, অম্বা অম্বিকা অম্বালিকা বৃত্তান্ত, দ্রোণ বনাম দ্রুপদ, শর্মিষ্ঠা বনাম দেবযানী, যযাতির যৌবনযাতনা ইত্যাদি আমার জানা ছিল, আবার জন্মেজয়ের যজ্ঞে মহাভারতের কথা শুনে এসে নৈমিষারণ্যে বসে সেই গল্প যে শোনাচ্ছিলেন যে উগ্রশ্রবা সৌতি, তাঁর বাবাও যে চমৎকার গল্প বলিয়ে ছিলেন আর বাবার নাম যে ছিল লোমহর্ষণ, এটা জানা ছিল না।

ব্যাস-এর ভাষা আমার চেনা লোকদের কারও কারও অপছন্দ হয়েছে, কিন্তু আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। সাধারণত মহাকাব্য আমরা যে রকম শ্রদ্ধাপূর্ণ, নতমস্তক ভাষায় পড়তে অভ্যস্ত শিবাজি সেটা সম্পূর্ণ পরিহার করেছেন। যেমন শর্মিষ্ঠা দেবযানী ঝামেলায় চরিত্ররা একে অপরকে অবলীলায় ‘দ্যাট বিচ!’ বলে তিরস্কার করছে, উগ্রশ্রবার শ্রোতারা তো ভয়ানক রসিক। 

লেখার থেকেও নজর কেড়েছে আমার ব্যাস-এর ছবি। মহাভারতের (বা যে কোনও মহাকাব্যেরই) যা মূল সুর, হিংস্রতা, সেটা ব্যাস দ্য বিগিনিং-এর প্যানেলে প্যানেলে পরিস্ফুট। জন্মেজয়ের যজ্ঞে সাপদের ধরে ধরে আগুনে ফেলার সময় সাপদের চোখেমুখে যে মৃত্যুআতংক, আমি দ্বিতীয়বার তাকাতে পারিনি। উগ্রশ্রবা এ গল্পে দাড়িওয়ালা বোরিং সাধু নন, তিনি রীতিমতো গল্পের মুড বুঝে মেকআপ পাল্টান, চোখ নাক মুখ আঁকেন, প্রপ্স বদলান। 

বইটি একটি সিরিজের অংশ। ব্যাসঃ দ্য বিগিনিং শেষ হয়েছে দ্রৌপদী এন্ট্রি নেওয়ার ঠিক আগে। পরের বইগুলো অতি অবশ্যই পড়ব, ঠিক করে রেখেছি।


October 13, 2017

Serious vs. Severe



SERIOUS procrastinator
























SEVERE Procrastinator



কৃতজ্ঞতাঃ www.raptitude.com


October 12, 2017

অন আ ডে লাইক দিস



একজন সাহেব, যিনি আমার সঙ্গে পদবীর দৈর্ঘ্যতুতো বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন, সেমিনারের শেষ বেলায় আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেমিনারের পরে আমার প্ল্যান কী। আমি বলেছিলাম, কী আর, ঘরে বসে রিপোর্ট শেষ করা। 

তাতে তিনি ভুরু আকাশে তুলে বলেছিলেন, 'অন আ ডে লাইক দিস?' জানালার বাইরে তাকিয়ে চোখ ঝলসে গিয়েছিল। আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, কংক্রিটের রাস্তায় পড়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদ ঠিকরোচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস চেপে সাহেবকে বলেছিলাম, ‘ইউ আর রাইট। চুলোয় যায় রিপোর্ট। বাড়ি ফিরে সারা গায়ে এস পি এফ পঁচাত্তর জবজবে করে মেখে হাফপ্যান্ট পরে দৌড়তে বেরোনোই আমার প্ল্যান।’ 

সাহেব হাঁফ ছেড়ে বলেছিলেন, 'গুড আইডিয়া।' 

সাহেবকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাহেব সামার নিয়ে লাফান, আমি উইন্টার নিয়ে। দিল্লিতে কে জানে কত বছর থাকার পর মনসুন নিয়েও।

ক’দিন ধরে শীতের প্রতীক্ষাটা চরমে উঠেছে। সার্চ করে করে এমন অবস্থা, ব্রাউজারে ডি টাইপ করলে ডেলহি টেম্পারেচার চলে আসছে, জানুয়ারি পর্যন্ত ম্যাক্সিমাম মিনিমাম টেম্পারেচার, আর্দ্রতা, বাতাসের দিক এবং গতি মুখস্থ হয়ে গেছে, তবু প্রতিদিন আবার করে দেখছি। দেখছি আর মনখারাপে ভুগছি। প্রতি সপ্তাহে একটা দুটো করে ছত্রিশ ডিগ্রি গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। কবে যে শীত আসবে, আদৌ আসবে কি না সেই নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে এখন। 

সেদিন কথা হচ্ছিল ওলাতে যেতে যেতে। ঠিক কোন মুহূর্তে নিশ্চিত হওয়া যায় একটা ঋতুর আসা বা যাওয়া? প্রথম যেদিন বাজারে ল্যাংড়া উঠল সেদিন প্রথম গরম পড়ল না প্রথম যেদিন এসি চালাতে হল সেদিন? জামাইষষ্ঠীর পর প্রথম যেদিন বৃষ্টি নামবে সেদিনই কি ধরে নেব বর্ষা এসেছে, নাকি আষাঢ় মাসের এক তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? যতদিন না হাঃ করলে মুখ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে ততদিন শীত এসেছে দাবি করা চলবে না নাকি বালতির জল গায়ে পড়লে ‘মাগো’ বেরোলেই যথেষ্ট?

মাঝে মাঝে ভ্রম হয়, শীত এসে গেছে বুঝি। ভোর হচ্ছে দেরিতে, সন্ধ্যে নামছে দ্রুত। ঘন ঘন ঠোঁট শুকোচ্ছে। এই সেদিন একটা ছোট বোরোলিন কিনে ব্যাগে রাখতে শুরু করেছি। কিন্তু দুপুরবেলা চা খেতে বেরোলেই সব আশা বিচূর্ণ। কী রোদ, কী তার তেজ, বাপ রে বাপ। 

এ বছর আর শীত আসবে না ধরেই নিয়েছি। নিয়ে এমন মেজাজ গরম হয়েছে যে সোমবার বাড়ি ফেরার পথে একজন ওলাভাইসাবকে ওয়ান স্টার দিলাম, সি আই ডি কলকাতার একটা পুরোনো এপিসোড চালিয়ে দশ মিনিটের বেশি দেখতে পারলাম না, আমার ফেভারিট রুটি আলুপোস্ত পর্যন্ত বিশ্রী তিতকুটে লাগল খেতে। 'ধুত্তেরি' বলে ঘুমোতে গেলাম। 

পরদিন চোখ খোলারও আগে টের পেলাম ব্যথাটা। একদল যন্ত্রী যেন সার দিয়ে বসেছে গলার ভেতর, তাদের খাঁজকাটা খাঁজকাটা বেহালার ছড়ে টেনে টেনে আমার ভোকালকর্ডে বিঠোভেনের নবম সিম্ফনি বাজাচ্ছে। হাঁ করলাম, আওয়াজের বদলে শুকনো ঘংঘঙে কাশি, বুকটা যেন দশখানা হয়ে ছিটকে পড়ল এদিকসেদিক। 

আমি কোনওমতে আঙুলের খোঁচা দিয়ে অর্চিষ্মানকে জাগালাম। পাঁচবার ঘুমচোখে 'কী? কী?' করার পর অবশেষে বালিশের পাশ হাতড়ে চশমা পরে অর্চিষ্মান তাকাল যখন, আমি আরেকবার হাসিমুখে ঠোঁট নেড়ে বললাম, ‘শীত এসে গেছে।’

*****

ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার ব্লাড প্রেশার নর্ম্যালি কমের দিকেই থাকে না?’ বললাম, ‘নব্বই ষাট। শুক্রবার রাতে মাপলে পঁচাশি পঞ্চান্নও বেরোতে পারে।’

ডাক্তারবাবু ভুরু কোঁচকালেন। একবার ভাবলাম বলব কি না যে এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। প্রেশার কীসে বাড়ল আমি জানি। কখন বাড়ল তাও জানি। চেম্বারে ঢোকার আগের আধঘণ্টায়।

এটা অবশ্য ডাক্তারবাবুর প্রাইভেট চেম্বার নয়, এটা হচ্ছে সমিতির চেম্বার। পুরোনো দূরদর্শী লোকেরা সমিতি খুলে গিয়েছিলেন, যেখানে সস্তায় নানারকম ডাক্তার দেখানো যায়, দাঁত থেকে শুরু করে কান থেকে শুরু করে শরীরের যে কোনও অংশে যে কোনও রকম যাতনা হলেই আমি আর অর্চিষ্মান ওখানে গিয়ে একখানা কুপন কেটে হত্যে দিয়ে পড়ি। সমিতিতে এয়ারকন্ডিশনিং নেই, ইউনিফরম নেই, অর্থাৎ সে সবের দাম আমাদের পকেট থেকে কাটে না। একখানা ধুদ্ধুড়ে ডেস্কটপের সামনে দুজন বসে থাকেন, ‘স্যার স্যার ম্যাম ম্যাম’ করেন না, খুচরো না দিতে পারলে রীতিমত ধমকান। কাচের গায়ে গোল ফোকর দিয়ে নিজের নাম, কাকে দেখাতে চাই সে ডাক্তারের নাম বললে খটাখট টাইপ করে, একখানা স্কেল ধরে প্রিন্ট আউটের নিচের অংশটুকু কেটে আমাদের হাতে দেন। ওটা আমাদের রিসিট, যেখানে লেখা আছে রেজিস্ট্রেশন + ডাক্তারের ফি বাবদ আমি কত টাকা দিয়েছি (যৎসামান্য)। ওপরের অংশটুকু চলে যায় ডাক্তারের ঘরে। ওটা আমাদের প্রেসক্রিপশন। ওখানেও আমার নামধাম বয়স ইত্যাদি ছাপা আছে। 

কিন্তু সবথেকে জরুরি জিনিসটা দুটোর একটাতেও ছাপা নেই। ওটা লেখা হবে হাতে। প্রেসক্রিপশন আর আমার রিসিট, দুটোরই  ডানদিকে মাথার ওপর অবহেলে একটা নম্বর লিখে গোল পাকিয়ে দেবেন কর্তৃপক্ষ।

ওটা আমার নম্বর। 

ডাক্তারবাবুর ঘরের সামনে যে জটলাটা জমেছে, তাদের মধ্যে আমি কার কার আগে আর কে কে আমার পরে, সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নির্ধারণ করবে এই সংখ্যাটি।

একটা বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় হয়েছি বলে বোধহয়, নম্বর আমাকে নার্ভাস করে দেয়। ধরা যাক আমার নম্বর ছয়। অর্থাৎ যারা জটলা করেছেন তাঁদের মধ্যে আমি ছ’নম্বরে যাব। কিন্তু এই তথ্যটা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অর্থহীন, যতক্ষণ না আমি জানছি পাঁচ নম্বর কোন জন। আমার পাশে এক মহিলা বসে আছেন, মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভয়ানক পেট ব্যথা, তাঁকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করি, 'আপনি কি পাঁচ, দিদি? আপনি কি পাঁচ?'

দিদি মুখব্যাদান করেন, ব্যথাটা নিশ্চয় মারাত্মক। কাঁপা কাঁপা হাত তুলে চারটে আঙুল দেখান। থ্যাংক ইউ। আমি ঘাড় অন্যদিকে ঘোরাই। সামনে কচি বাচ্চা নিয়ে এক মা বসে আছেন। বাচ্চাটা ভুরু কুঁচকে মোবাইলে প্যাঁ পোঁ শব্দ করে গেম খেলছে। মা একবার মোবাইল ফেরত চাইতে গেছিলেন, বাচ্চা এমন ঘ্যাঁক করে উঠেছে যে মা ছিটকে সরে এসেছেন। খেলো বাবা, যত প্রাণে চায় খেলো। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনারা কত নম্বর?’ 

পাঁচ। যাক। অল্প পরিশ্রমে বেরিয়েছে। মা হলে কী হবে, বয়সে নির্ঘাত আমার থেকে দশ বছরের ছোট, ভারি নিরীহ মুখ মেয়েটির। নেক্সট জরুরি প্রশ্নটার জন্য আমি ওকেই পাকড়াও করি। ‘কত নম্বর গেছে ভেতরে?’ মেয়েটির মুখ করুণ হয়। ‘এই তো সবে প্রথম জন। এত লেট করে এলেন…’

তা ঠিক। আমাদের ডাক্তারবাবু একটু লেটলতিফ।

এইবার আমার শান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। জরুরি তথ্য সব জানা হয়ে গেছে। বাকি যে যখন খুশি যাক, পেটব্যথা মহিলার পর মা আর বাচ্চা যাবে, মা আর বাচ্চার পর আমি যাব, ব্যস।  

কিন্তু আমি শান্ত হই না। কারণ আমার পাশে মহিলা ততক্ষণে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। উনি কার পরে যাবেন সেটা খেয়াল রাখার অবস্থায় উনি আর নেই মনে হচ্ছে, কাজেই আমাকেই কাজে নামতে হয়।

আমি চোখ সরু করে বাকিদের মাপি। ভিডিও গেম খেলা বাচ্চার পাশে একটা রোগা মতো ছেলে বসে আছে, হাতে বিরাট এক্স রে-র ঠোঙা। বসে হাঁ করে তাকিয়ে আছে এদিকের দেওয়ালে লাগানো টিভির দিকে। এদিকের চেয়ারের সারিতে অর্চিষ্মানের ওপাশে আরেকজন বসে আছেন, চাপা জিনস, নাগরা কাটিং বুটজুতো, কবজি থেকে রুপোলি তাবিজ আর নীল রঙের হেলমেট ঝুলছে। 

এদের দুজনের মধ্যে একজন দুই, অন্যজন তিন। কোনজন কে, সেটা আমাকে বার করতে হবে। 

সোজা জিজ্ঞাসা করলেই হয়। কিন্তু পাছে আমাকে কেউ ম্যানিয়াক ভাবে, রিস্ক নিই না। অর্চিষ্মানকে বলি, 'জিজ্ঞাসা কর না, উনি কত নম্বর।' অর্চিষ্মান পয়েন্ট ব্ল্যাংক রিফিউজ করে। 

'আমাদের ছ’নম্বর। আর আমাদের পরে কেউ আসেনি, কাজেই আমরা সবার লাস্টে যাব। তাই তো?'

আমি নিমরাজি ঘাড় নাড়ি। 

'তাহলে আর জিজ্ঞাসা করে লাভ কী, অপেক্ষা কর।'

অকাট্য যুক্তি।

আমি বলি, ‘আচ্ছা জিজ্ঞাসা করতে হবে না, তুমি আড়চোখে একটু খেয়াল রাখো, হেলমেটওয়ালা ওই যে সাদা কাগজটা হাতে নিয়ে পাকাচ্ছে, একবার খুলছে, আবার ভাঁজ করছে, ওটার ডানদিকে মাথার ওপর নজর রাখ।’

অর্চিষ্মানের মুখ দেখে আমার সন্দেহ হয়, ব্যাপারটাকে ও যথেষ্ট সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। অগত্যা আমিই উঁকিঝুঁকি মারতে থাকি। একবার কাগজ প্রায় খোলোখোলো হয়েও খোলে না, আরেকবার জাস্ট একবার নীল রঙের একটা আবছা আভাস চোখে পড়ে মিলিয়ে যায়। সাসপেন্স সহ্যাতীত। এদিকে ডাক্তারবাবুর ঘরের ভেতর খকখক কাশির শব্দ জোর হয়ে উঠছে। দরজা খুলে যায়। কাশতে কাশতে প্রায় হুমড়ি খেয়ে এক নম্বর বেরিয়ে আসেন।

হেলমেট উঠে দাঁড়িয়েছে। দৃপ্ত ভঙ্গিতে নাগরাই বুট এগিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারবাবুর ঘরের দিকে। 

আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াই। বাঁ হাত তুলে হেলমেটের রাস্তা আটকাই। জাস্ট একটা গাট ফিলিং।

উল্টোদিকের এক্সরে-কে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার নম্বর কত?’

“হাঁজি?”

“বলছি আপকা নম্বর কিতনা হ্যায়?”

ভদ্রলোক ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকেন। আমি ইশারায় হাতের চিরকুটটা দেখাই। ভদ্রলোক খোলেন। যা ভেবেছি তাই। জ্বলজ্বল করছে ‘দুই’।

বিজয়গর্বে অর্চিষ্মানের দিকে তাকাই। ধীরে, অতি ধীরে অর্চিষ্মানের মাথা দু’দিকে নড়ে। 
   
*****

ডাক্তারবাবুকে বললাম, “চিন্তা করবেন না, প্রেশার নেমে যাবে। টেম্পোরারি মনে হয়।”

ডাক্তারবাবু আশ্বস্ত হয়ে অন্যদিকে মন দিলেন। একটা পাতলা কঞ্চি জিভের ওপর চেপে ধরলেন, বললেন, ‘আআআ করুন।’ করলাম, ঠিক যেন ফাঁদে পড়া ভেড়া। ডাক্তারবাবু বলেন, “বাঃ বাঃ, বেশ টমেটোর মতো লাল করেছেন দেখছি।” বলে গড়গড় করে খানদশেক উপসর্গ বলে গেলেন, কিছু মিলল, কিছু মিলল না। কাল থেকে সবক’টা শুরু হবে, আশ্বাস দিলেন। ‘গার্গল করবেন, সিরাপ খাবেন দিনে তিনবার, অ্যান্টিবায়োটিক দিলাম না, পাঁচ দিনে না সারলে দেখা যাবে। এখন খালি বেশি করে জল খাবেন আর শুয়ে থাকবেন। অসুবিধে হলে ফোন করবেন, বুঝেছেন?’

ঘাড় নেড়ে থ্যাংক ইউ বলে ওষুধ কিনে বাড়ি চলে এলাম। টেবিলের ল্যাপটপ আর কোটি কোটি ডেটা কেবল সরিয়ে ফেলে এখন সে সব ওষুধের সবুজ শিশি আর রাংতা ফয়েল আর এনার্জি পাউডার রাখা হয়েছে। আমি টেবিলের পাশে খাটে বালিশ পিঠে গুঁজে বসেছি, ক্লান্ত লাগলেই সড়াৎ করে নেমে টুকটাক ন্যাপ নিচ্ছি, অর্চিষ্মান ঘন ঘন ফোন করে খবর নিচ্ছে। ঠিক করে খাচ্ছি কি না, বেশি ক্লান্ত লাগছে কি না। আমি বলছি, না না চিন্তা করার কোনও কারণই নেই। পরশুর থেকে কাল অনেক বেটার ছিলাম, কালকের থেকে আজ আরও ভালো।

ওষুধ তো কাজে দিচ্ছে নিশ্চয়, কিন্তু আমার ধারণা ওষুধের থেকেও বেশি কাজে দিচ্ছে ডাক্তারবাবুর অন্য পথ্যটা। গোটা সপ্তাহ যাওয়া তো দূরঅস্ত, অফিসের কথা ভাবা পর্যন্ত বারণ করে দিয়েছেন।



October 08, 2017

এ মাসের বই/ সেপ্টেম্বর ২০১৭/১/ রাগ'ন জোশ



উৎস গুগল ইমেজেস


‘ধর’ শুনে প্রথমে খুব লাফিয়েছিলাম, কিন্তু শীলা আসলে বিবাহসূত্রে কাশ্মীরী পণ্ডিত ‘ধার’, বাঙালি ‘ধর’ নন। শীলার কোনওকালেই বাঙালিদের সঙ্গে কোনও সংস্রব ছিল না, কারণ ধার হওয়ার আগে তিনি ছিলেন মাথুর কায়স্থ। 

শীলা ধারের লেখা রাগ’ন জোশ বইটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। হোম (তখনও তিনি ধার হননি, মাথুর কায়স্থ জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড় হচ্ছেন), মিউজিশিয়ানস (বিভিন্ন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পীর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত আলাপ পরিচয়ের গল্প), আদার পিপল ( এখানে মূলত স্বামী পি কে ধারের ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় সেখানকার ঠাটবাট চলনবলন, এবং ভারত সরকারের পাবলিকেশন ডিভিশন লেখকের চাকরির সময়কার মানুষজন, অভিজ্ঞতার  কথা জায়গা পেয়েছে) দ্য কুকিং অফ মিউজিক অ্যান্ড আদার এসেজ (এই চ্যাপ্টারে রয়েছে রাগ রাগিণী সম্পর্কিত টেকনিক্যাল প্রবন্ধ), এবং পরিশিষ্টে শীলা ধারের দুখানি অবিচুয়ারি। 

আমার মতে বইটির সবথেকে চমকপ্রদ এবং উপভোগ্য অংশ হচ্ছে প্রথম এবং দ্বিতীয় অংশদুটি। শীলা ধার অত্যন্ত প্রিভিলেজড বাড়িতে জন্মেছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা ব্যারিস্টার অ্যাট ল ছিলেন, এবং সিভিল লাইনস-এ প্রাসাদোপম অট্টালিকা বানিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিপত্তি এমনই ছিল যে ‘সাত নম্বর’ কানে শুনতে ভালো লাগে বলে বাড়ির নম্বর সাত রাখা হয়েছিল, আগেপিছে ছয় কিংবা আটের চিহ্নমাত্র না থাকা সত্ত্বেও। শুধু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মাথুররা ‘কালচার্ড’ও ছিলেন বলাই বাহুল্য। তাঁদের বাড়িতে সঙ্গীতের মহামহোপাধ্যায়দের মিছিল লেগেই থাকত, বইতে সে সব তথ্য ছড়িয়ে আছে।

এই রকম বাড়িতে জন্মালে দৃষ্টি নষ্ট হওয়ার একটা বিপদ সবসময় থেকে যায়। আমি বড় বাড়িতে জন্মানো সেলেব্রিটিদের আত্মজীবনী পড়ে দেখেছি, তাঁদের সবসময়েই চেষ্টা থাকে এই প্রিভিলেজ, এই এলিটিজমকে ছদ্ম তাচ্ছিল্যের চোখে দেখার, কারণ আফটার অল যারা বইটা কিনবে তারা সবাই ছাপোষা মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ, তাদের চোখে নিজেকে ‘রিলেটেবল’ প্রতিপন্ন না করতে পারলে বই বিক্রি হবে না। কাজেই তাঁরা যথেষ্ট পরিমাণে নিজেদের ব্যাকগ্রাউন্ডের নিন্দেমন্দ করলেও সে নিন্দের মধ্যে একটা প্রশ্রয়ের ভাব প্রকট থাকে। 

শীলা ধারের লেখায় সেটা এক্কেবারে অনুপস্থিত। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে নিজের মায়ের সঙ্গে শীলার গভীর সংযোগের সম্পর্ক, এবং সেই মায়ের প্রতি ওই বড় বাড়ির লোকজনদের ভয়াবহ আচরণ। 

শুধু বাড়ির ক্ষেত্রে নয়, পরবর্তীকালে গানের দুনিয়া নিয়ে লেখার সময়েও শীলা সমান স্পষ্টবাদী। শিল্পীরা বেশিরভাগ সময়েই খুব সুবিধের লোক হন না, তাঁদের হিংসেহিংসি, দলাদলি, একে অপরকে ক্রমাগত তাচ্ছিল্য করার চেষ্টা, সবই শীলা লিখেছেন। হিন্দুস্থানি বনাম কর্ণাটকীর যুদ্ধ, ঘরানা বনাম ঘরানার লড়াই, এই হাস্যকর কিন্তু সত্যি ব্যাপারগুলো ধামাচাপা দেননি। 

আর সবই লিখেছেন গভীর কৌতুকের দৃষ্টিতে। রাগ’ন জোশ-এর আরও একটা রিফ্রেশিং ব্যাপার হচ্ছে বইখানার অশ্রদ্ধামূলক ভঙ্গি। ক্লাসিক্যাল জগতের ওই নাম বলার আগে কান ধরে জিভ কাটার অসহ্য তৈলাক্ত বিনয় নেই শীলার। তিনি বেগম আখতারের ‘ভিকটিম সিনড্রোম’এর কথা অনায়াসে লিখেছেন, নিজের গুরু প্রাণনাথের স্বার্থপরতার কথাও বাদ দেননি। এবং এগুলো লেখার সময় কখনও আমার মনে হয়নি যে তিনি এঁদের কাউকে মন থেকে অপছন্দ করেন। একেবারেই না। শীলা নিজেই লিখেছেন,

“I love and admire the artistes that figure in this book. The eccentricities and frailties I have described do not diminish them in any way. On the contrary, they are intended to enhance the charm of their rich personalities.

অফ কোর্স, রাগ’ন জোশ-এর মূল জোর হচ্ছে গল্প। গল্পের পর গল্প। সে এমন গল্প, সবাইকে ধরে ধরে শোনাতে ইচ্ছে করে। “এই জায়গাটা শোনো” বলে কতবার যে অর্চিষ্মানের কান থেকে হেডফোন খুলিয়েছি আমি।

আপনাদেরও শোনাব ভেবেছিলাম। একটার পর একটা গল্প পড়ছি আর ভাবছি, রিভিউ লেখার সময় এই গল্পটা দেব। কিন্তু কোনটা দেব? সিদ্ধেশ্বরী দেবী প্রথমবার বিলেত যাওয়ার সময় তাঁর এক গুণমুগ্ধ যে ‘দ্য গ্রেট লেডি গোয়িং টু লন্ডন’ এই একটাই লাইন ক্রমাগত পুরিয়ায় গাইতে গাইতে সঙ্গে চলেছিলেন সেইটা? নাকি ফৈয়াজ খানের দর্শনার্থীদের অসীম ধৈর্যের গল্পটা? নাকি প্রথমবার লেখকর রেডিও রেকর্ডিং-এর গল্পখানা, যেটা পড়তে পড়তে হাসির চোটে আমি কি-বোর্ডের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলাম আর অবান্তরের সেভ না করা অর্ধেক পোস্ট ডিলিট হয়ে গিয়েছিল?

বলার মতো অসংখ্য গল্পের মধ্যে থেকে আমি শেষমেশ সারেঙ্গী ওস্তাদ বুন্দু খানের গল্পটা বেছে নিলাম। 

“..his visits to us must have been a relief from the noisy and congested environment of his  own large joint family establishment in Suiwalan in the Old City. He was not really concerned about the poor living conditions. What bothered him was having to deal with the world outside music. He once told us that when he was young, he was expected to do errands in the vegetable market for his mother and aunts. ’It seemed to take forever’, he said with a tortured expression. We quite understood that the real hardship for him must have been the time he was forced to be away from music. To get over the problem, he designed a small bamboo sarangi which he could sling over his shoulder unobtrusively and use for practice with the finger of his left hand without making any sound while he went about his extra-musical chores. He added that he would drape a light shawl over the left shoulder to hide the sarangi so that he didn’t have to listen to casual comments from passing busybodies."

“One Sunday morning Bundu Khan got lost in our house. Dependable old Masoom Ali, my grandfather’s chauffeur, had driven the family dodge to Suiwalan and brought the maestro back in accordance with my father’s standing instructions and deposited him on the veranda. After a few moments my father hurried out of his dressing room to greet him but he was nowhere to be seen. Not in the lavatory, not still in the car, not on the terrace, nowhere. My father’s faithful valet, the smirking Jai Singh whom we all hated, was sent hunting everywhere without result. Half an hour after the panic set in we heard the faint, scratchy sounds of a sarangi. They seemed to be coming from the garden but we could not see anyone there. We followed my father in the direction of the sound and tracked it down to a tall, thick hedge of sweetpeas that divided the huge garden in front of our house into two sections. Ustad Bundu khan was lying in the flower bed on the farther side, his instrument balanced on his chest and shoulder, his eyes closed, completely engrossed in the music he was playing. Even my father who prided himself on courtly manners did not know how to awaken such a great musician from his reverie, or how to call such a revered name aloud. Anyhow, with much fake coughing and embarrassed clearing of the throat, my father managed to catch his attention. Ustad Bundu khan opened his eyes, just a slit, and scrambled on his feet when he saw the concern on the faces of the small assemblage. 

‘It is spring time, and I was playing for the flowers’, he said in complete explanation.

শীলা ধারের রাগ’ন জোশ আমার এ বছরের পড়া অন্যতম সেরা বইয়ের মধ্যে থাকবে।


October 07, 2017

কয়েকটা লিংক






গান্ধী সম্পর্কে অরওয়েল।

মঙ্গলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে।


স্পিনস্টার কথাটা যে আর চলে না সেটা জানতাম, দু’হাজার পাঁচ থেকে ব্যাচেলরও নাকি ব্যাকডেটেড। 

যে কুমীরের ডায়েট ডাইনোসর, তার সাইজ যে পিলে চমকানো হবে তাতে আর আশ্চর্য কী।

রিসার্চের নামে অ্যাডভাইসরের জলটল বয়ে দিতে শুনেছি, কিন্তু মার্ডার মিস্ট্রি লেখার রিসার্চের নামে সত্যি সত্যি মার্ডারটা একটু বাড়াবাড়ি। 

পৃথিবীতে সব রঙের নাম দেওয়ার মতো ভাষা নেই আমাদের।

সবাই এই লিস্ট মেনে চললে আমার হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ইচ্ছে আবার ফিরে আসবে, আমি নিশ্চিত। 

রোজ সকালে উঠে দশবার বলব আমি, আপনারাও বলা অভ্যেস করুন। এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার। এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার। 

ভাগ্যিস গুগল মনে করাল, না হলে তো জানতেই পারতাম না আজ এঁর জন্মদিন।


October 06, 2017

ঝালমুড়ি আর চাঁদ



ঝালমুড়ি খাওয়া আর এমন কী শক্ত ব্যাপার, বলবেন আপনারা। যাও, অর্ডার দাও। দাম জিজ্ঞাসা করতেও পার, আবার দাম নিয়ে মাথা একেবারে না-ই ঘামাতে পার কারণ প্রোহিবিটিভ দাম হওয়ার জন্য ঝালমুড়ি না খেতে পেয়ে ফিরে আসতে হবে, সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

প্রোহিবিটিভ দাম হলেও যে সব ক্ষেত্রে ফিরে আসা যায় এমন নয়।  সি আর পার্কের মোটামুটি সব তরিতরকারিওয়ালাই ডাকাত, কিন্তু একজন আছেন ডাকাতদলের সর্দার। তাঁর দাম শুনে কেউ অবাক হলে তিনি আরও অবাক হয়ে বলেন, “এ কি দিল্লির পচা মাল পাইসেন নাকি? আমার কাছে যা দ্যাখতাসেন সব কলকাতার।” এই সর্দারের কাছ থেকে আমি পঁচাত্তর টাকা দিয়ে একবার একখানা ফুলকপি কিনেছিলাম। আমারই দোষ হয়েছে, দাম জিজ্ঞাসা না করে ফুলকপি দিতে বলেছি। আরও কী সব নিয়েছিলাম সঙ্গে, আলু পটল লালশাক। টোটাল শুনে চোখ কপালে তোলাতে ডাকাতসর্দার হেসে হেসে বললেন, “কপিটাই তো পঁচাত্তর।” আমি মুখ বুজে ফুলকপি নিয়ে বাড়ি চলে এলাম, আর পরদিন আলু দিয়ে তরকারি রাঁধার সময় ভাবতে লাগলাম, কপিটা দেখতে কিন্তু ভালো, ফটফটে ফর্সা, ঠিক বিগ বাজারের অ্যাডের মতো। সস্তা কপি হলে হয়তো দাগটাগ থাকত। খেতে বসে ক্রমাগত বলে চললাম, “কপিটার টেস্ট কিন্তু ভালো, বল? ধাপার মাঠের রিয়েল ফুলকপির মতো খেতে। তাই না? তাই না?” বলতে বলতে প্রায় যখন গলা বুজে এসেছে, চোখে জল আসে আসে, অর্চিষ্মান বলল, “ওরে বাবা কুন্তলা, কিছু ক্ষতি হয়নি পঁচাত্তর টাকার ফুলকপি কিনে। এখন শান্তিতে খাও তো।” 

(“শান্তিতে খেতে দাও তো” বলেনি কিন্তু, ও রকম করে কখনও বলে না অর্চিষ্মান, ভীষণ ভদ্র ছেলে।)

অত গায়ে লাগলে ব্যাগ থেকে কপি বার করে বাড়ি চলে আসাই উচিত ছিল, সাধ্যে না কুলোলে বা অযৌক্তিক খরচ মনে হলে হাত তুলে চলে আসাই আমার নীতি, কিন্তু আমি ডাকাতসর্দারের ক্ষেত্রে সেই নীতি কখনও প্রয়োগ করে উঠতে পারিনি। এঁর পার্সোন্যালিটিই আলাদা। আরেকদিন টোটাল দাম শুনে ঢোঁক গিলে জিজ্ঞাসা করেছি, “এই যে করলা, থুড়ি, কলকাতার করলাগুলো নিলাম, দাম কত?” সর্দার টং থেকে ভুরু কুঁচকে গর্জন করলেন, “এহন জিগায়া কী হবে? দিয়া দিসি তো।” আমি নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললাম, “না না, এমনিই জিগাচ্ছি আরকি।”

প্রোহিবিটিভ দামের জন্য একেবারেই যে কিছু ব্যাগ থেকে বার করাইনি তা নয়। ওই সর্দারের দোকানেই করেছি। সর্দার ছিলেন না, তাঁর চ্যালা ছিল। আমিও নরম মাটি পেয়ে আঁচড়ালাম। কাঁচা আমের সিজন ছিল। বেশ কিছুদিন ধরে অর্চিষ্মানের কাঁচা আমের চাটনির কথা মনে পড়ছিল। সর্দারের দোকানের ঝুড়িতে ঢিবি করে কাঁচা আম রাখা ছিল। তাদের সবুজ রঙে সর্দারের দোকানের টিউবলাইটের আলো পিছলে যাচ্ছিল। টাকা দিয়ে চলে আসার আগে কী মনে হল, আম দু’খানার দাম জিজ্ঞাসা করলাম। একশো তিরিশ বা তার কাছাকাছি কিছু একটা। আমি চ্যালাকে দিয়ে ওই জোড়া কাঁচা আম ব্যাগ থেকে বার করিয়ে টাকা ফেরত নিয়েছিলাম। তারপর সফল-এ এসে একজোড়া আম কিনেছিলাম আঠেরো টাকায়। একশো আঠেরো নয়, জাস্ট আঠেরো। হ্যাঁ, সবুজ অত সতেজ ছিল না, চামড়া কুঁচকেও গিয়েছিল জায়গায় জায়গায়। কিন্তু চাটনি বানানোর পর কিচ্ছু টের পাইনি। 

ঝালমুড়ির ক্ষেত্রে এমন হওয়াটা একটু শক্ত। কত আর বেশি দাম হবে। দশের জায়গায় পনেরো। শুনে হয় আপনি চুপ করে থাকবেন বা তেমন স্মার্ট হলে সঙ্গীকে বা সঙ্গীর অভাবে দোকানদারকেই বলবেন, “আমাদের ছোটবেলায় এসব দু’টাকায় খেয়েছি। ঠোঙার সাইজও ছিল ডবল।” আর কেউ কেউ থাকবেন বলবেন, “এগুলো আর বাড়িতে বানাতে কী, মুড়ি নাও, সর্ষের তেল নাও, চাট মশলা, ভাজা মশলা, একটু সেদ্ধ ছোলা আর কাবলি, সেদ্ধ আলু, ব্যস হয়ে গেল, ঝালমুড়ি। হ্যাঁ, কাঁচালংকাগুলো একটু মিহি করে কুচোতে হবে। ব্যস। বাঙালি ডি আই ওয়াই করবে না, খালি দাম দাম বলে চেঁচালে হবে?”

আমি অলমোস্ট গ্যারান্টি দিতে পারি এই শেষ দলের লোকেরা জীবনে দু’বারের বেশি রান্নাঘরে ঢোকেননি। চোখে দেখে কাবলি ছোলা আর অড়হর ডালের তফাৎ বলতে পারবেন না। 

চেনা ঝালমুড়িওয়ালা হলে তো আরওই মজা। দাঁড়িয়ে অর্ডার দেওয়ারও দরকার নেই, যেতে যেতে বলে যাও, “দুটো প্যাক করে রাখুন দাদা প্লিজ, আমি ফুলকপি কিনে আসছি।”  দুটো মুড়ির একটায় যে ঝালনুন নর্ম্যাল, আরেকটায় যে দুটোই অ্যাবনর্ম্যালি বেশি আর নারকেল বাদ, এসব ওঁদের মুখস্থ হয়ে গেছে। 

তাই যখন দেখলাম দাদা নারকেল ফালি তুলেছেন হাতে, অবাক হলাম। দাদার মুখটা যেন কেমন উদাস উদাস। সারাদিন অন্যত্র যে কাজে যান দাদা, হয়তো সেখানে কোনও মনোমালিন্য হয়েছে। হয়তো কেউ কড়া গলায় কথা বলেছে। হয়তো ছেলেমেয়ের রেজাল্ট ভালো হয়নি। হয়তো পুজোয় কিনে দেওয়া নতুন জুতো অলরেডি ছিঁড়ে ফেলেছে। হয়তো স্ত্রীর কাশিটা যাচ্ছে না। হয়তো দেনা জমে গেছে অনেক, খাতক তাগাদা দিচ্ছে। হয়তো মায়ের ক্যান… 

স্টপ। জাস্ট স্টপ। নিজের কল্পনাকে জোর ধমক দিলাম। তারপর আস্তে করে বললাম, “নারকেল লাগবে না দাদা।” 

দাদা আমার মুখের দিকে তাকালেন। গোঁফের ফাঁকে হাসি ফুটল। “ওহ। লবণ একটু বেশি যাবে তো?” 

দাদা কবজি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুড়ি মাখতে লাগলেন। চারপাশে অন্যান্য দিনের থেকে বেশি ভিড়। তবে কালকের থেকে কম। নাড়ু, ফুলের মালা, মঠ, কদমা, নারকেলের আজ ভাঙা হাট। আজ কিনছে যারা অগোছালো, কোনও কিছুই সময়ে করে উঠতে পারে না, কিংবা ভাঙা হাটে কম দামে জিনিস পেলে যাদের সুবিধে হয়। অনেক বাড়িতে হয়তো পুজো হয়েও গেছে। রিষড়াতেই টুকাইদা পুজোতে বসে গেছে খবর পেয়েছি। একটু বাদে ঘণ্টা নেড়ে উঠে পড়লেই নাড়ু, নিমকি, মঠ, কদমা, চালমাখা, ডালমাখা, সন্দেশ নিয়ে আপ্যায়নে নামবেন মা আর বিজলিদি। আর আমি তখন নাপতোল চালিয়ে ঝালমুড়ি চিবোব। 

আমার মুখটাও দাদার মতো উদাস হয়ে গেল। দাদা মুড়ি মাখতে মাখতে মাঝে মাঝে মুখ তুলে সামনের আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। অন্যদিন যেমন সম্পূর্ণ মনোযোগ স্টিলের ক্যানের স্থাপিত করে স্টিলের হাতা ঘুরিয়ে মুড়িতে ঝড় তোলেন, আজ দাদার তেমন মনোযোগ নেই।

একজন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ছ’ফুট লম্বা, দেড়ফুট চওড়া। এঁকে আমি চিনি, মানে দেখেছি। রোগা হওয়ার চেষ্টা করছেন বোধহয়। দাদার কাছ থেকে স্প্রাউট চাট নিয়ে এগরোলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে করুণ মুখে খান। দাদার মুড়ি বানানো শেষ। ঠোঙাদুটোর মুখ যত্ন করে মুড়ে ঘুগনির ডেকচির ঢাকনার ওপর রেখে স্প্রাউটের বাটির গামছাঢাকা সরিয়ে অঙ্কুরিত ছোলা তুলবেন বলে দাদা হাত মুঠো করলেন, আমি ঠোঙাদুটো ব্যাগে পুরে পেছন ফিরে ব্যাগের চেন টানতে টানতে মুখ তুললাম, বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। 

ওটা কী? কৃষ্ণা এস্টেটের ব্যানারের ওপারের ঝাঁকড়া গাছটার মাথার মারাত্মক কাছে, আকাশের গায়ে ওটা কী? আমাদের চেনা চাঁদ? এত গোল? এত বড়? এত জ্যান্ত যেন অল্প অল্প দুলছে?

চাঁদটা দেখতে দেখতে হাঁটব বলে বাঁদিকের শর্ট রাস্তায় না গিয়ে সোজা রাস্তা ধরলাম। চাঁদও তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আর আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দাদার দিকেও। চাঁদের চোখে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম, রোগ নয়, শোক নয়, দুঃখ নয়, কষ্ট নয়, দাদার অমনোযোগের জন্য একমাত্র দায়ী যেন হয় কোজাগরীর চাঁদ। 


October 04, 2017

(অবহেলিত?) আট



ক’দিন আগেও যেমন সাড়ে পাঁচটাতেই চারদিকে হা হা আলো, এখন ছ’টা সতেরোতেও জানালার বাইরে কারি গাছের অবয়ব অস্পষ্ট। তিন্নির দেওয়া কাগজের ল্যাম্পের হলুদ আলোর আবেশ এখনও মায়াবী। হাতের তেলোয় দ্বিতীয় কাপ চায়ের আরাম, কানে অঞ্জন, চোখের সামনে অবান্তর। মুহূর্তটার পারফেকশন আমাকে দুর্বল করে দেয়। আহা, অবান্তর। সেই কবে থেকে…

একটা আতংক মাথার মধ্যে ব্রেক ক্যাঁ——চ করে ব্রেক কষে। গত মাসে অবান্তর আট পেরিয়ে নয়ে পা দিয়েছে।এবং আমি সেটা সম্পূর্ণ ভুলে গেছি।

খসখসিয়ে লাল ডায়রির পাতা উল্টোই। এই তো, টেনথ সেপ্টেম্বর। কী রাজকার্য করছিলাম আমি? পেপার লিখছিলাম? মাস্টারপিস উপন্যাসের ছক কষছিলাম? ছোটগল্প ভাঁজছিলাম? নাকি ইদানীং যা নিয়ে জীবনে হুলাবিলার অন্ত নেই সেই অনুবাদে আবিষ্ট ছিলাম? কিচ্ছু না। ইন ফ্যাক্ট, অবান্তরের আট পেরিয়ে নয়ে পা রাখার দিনটাতে আমি অবান্তরেই যকের ধন-এর রিভিউ পোস্ট করছিলাম। 

আমি জানি না এর প্রায়শ্চিত্ত হয় কি না, বা হলেও অবান্তর সেটা অ্যাকসেপ্ট করবে কি না। অবান্তরকে দেখতে নিরীহ ভালোমানুষ হলে কী হবে, দরকার বুঝে ঘরের কোণে মুখ নিচু করে বসে নখ খুঁটতে খুঁটতে “আমাকে তো কেউ ভালোবাসে না, আমার জন্মদিন তো সবাই ভুলে যায়” বলে গিল্টে ভাজাভাজা করতে জানে।

তবু চেষ্টা তো করতেই হবে। তাই জন্মদিন পেরিয়ে যাওয়ার চব্বিশ দিন পর আমি অবান্তরের আট বছর উদযাপন করছি। এবং ন্যূনতম যে আট রকম ভাবে (ভাবলে আশি রকম বেরোবে) অবান্তর আমার জীবন বদলে দিয়েছে,  তা সবার সামনে স্বীকার করছি।

১। অবান্তর আমাকে আমার সারাদিনের একমাত্র ভালোলাগা কাজটার সন্ধান দিয়েছে।
২। অবান্তর আমাকে সেই ভালোলাগা কাজটা ক্রমাগত প্র্যাকটিসের সুযোগ দিয়েছে।
৩। অবান্তর আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে কোনও কিছুতে “লেগে থাকার” উপকারিতা (এবং তৃপ্তি) বুঝিয়ে দিয়েছে। 
৪। গত আট বছরের আর্কাইভ চোখের সামনে মেলে ধরে অবান্তর আমাকে ক্রমাগত সর্বক্ষণ মনে করাচ্ছে, কী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কী পরিমাণ হাসির পাত্র আমি বানিয়েছি নিজেকে।
৫। এবং সেই একই যুক্তিতে, এখন যা হচ্ছে, সেটাও হাস্যকর ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না। 
৬। অবান্তর কক্ষনও নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমার চরিত্রের বাইরে গিয়ে নেটওয়ার্কিং-এ বাধ্য করেনি।
৭। অবান্তর আমাকে আমার বুদবুদের বাইরে পা না রেখে ইন্টারেস্টিং মানুষের সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। 
৮। মুখে যা-ই বলুক না কেন, অবান্তর আমাকে ভালোবেসেছে। সত্যি সত্যি ভালোবেসেছে। না হলে কেউ আট বছর (অ্যান্ড কাউন্টিং) আমার মতো বোরিং লোকের সঙ্গে থেকে যায় না।

বিলম্বিত কিন্তু একটুও অবহেলিত নয়, জন্মদিনের অনেক অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালোবাসা, অবান্তর। তুমি না থাকলে আমিও নেই।

পুনশ্চঃ বিলম্বিত জন্মদিনে অবান্তর আপনাদের একটা গান শোনাতে চায়। আমি বলেছিলাম, এটা একটু বেশি নাটকীয় হয়ে যেতে পারে, তাতে অবান্তর “চব্বিশ দিন” বলে মুখ কাঁদো কাঁদো করল এবং আমার রাজি না হয়ে উপায় থাকল না। গানটার কথায় ‘এন্ড’, ‘ফাইন্যাল কার্টেন’ ইত্যাদিগুলো শব্দগুলো অগ্রাহ্য করবেন, ওগুলো আজকের অনুষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রযোজ্য হচ্ছে গানটার সার বক্তব্যখানা। আর হ্যাঁ, লাস্ট লাইনটা গাওয়ার সময় ‘দ্য কিং’ যখন হাঁটু বেঁকিয়ে হাত ছড়িয়ে মঞ্চের ওপর স্থির হচ্ছেন, অবান্তর আপনাদের জানিয়ে দিতে বলেছে, ওই ভঙ্গিটাই অবান্তরের আসল স্পিরিট। 






 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.