December 07, 2016

Morality vs. Self Righteousness



"I followed my own conscience.” “I did what I thought was right.” How many madmen have said it and meant it? How many murderers? Klaus Fuchs said it, and the men who committed the Mountain Meadows Massacre said it, and Alfred Rosenberg said it. And, as we are rotely and rather presumptuously reminded by those who would say it now, Jesus said it. Maybe we have all said it, and maybe we have been wrong." 

 . .  . Of course we would all like to “believe” in something, like to assuage our private guilts in public causes, like to lose our tiresome selves; like, perhaps, to transform the white flag of defeat at home into the brave white banner of battle away from home. And of course it is all right to do that; that is how, immemorially, things have gotten done. But I think it is all right only so long as we do not delude ourselves about what we are doing, and why.

. . . It is all right only so long as we recognize that the end may or may not be expedient, may or may not be a good idea, but in any case has nothing to do with “morality.” Because when we start deceiving ourselves into thinking not that we want something or need something, not that it is a pragmatic necessity for us to have it, but that it is a moral imperative that we have it, then is when we join the fashionable madmen, and then is when the thin whine of hysteria is heard in the land, and then is when we are in bad trouble.

                                                                                                 Joan Didion

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Brain Pickings


December 06, 2016

বার্ষিক জমাখরচ ১/৪



ঠাণ্ডা ছাড়া ডিসেম্বরের আরেকটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে ব্লগের বিষয়ের প্রাচুর্য। কোন কোন রেজলিউশন রাখা হল না, সামনের বছরের জন্য কী কী রেজলিউশন নিলাম, কী নিজের সম্পর্কে কী কী জানলাম, কী বই পড়লাম, টপ ফাইভ বুকস, টপ ফাইভ ফিল্মস, টপ ফাইভ রেস্টোর‍্যান্টস। এত বিষয় যে কবে কোনটা নিয়ে লিখব বোঝা মুশকিল। একবারে সব নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। তাই ঠিক করেছি প্রতি সপ্তাহে একটা করে এই মর্মে পোস্ট লিখব। প্রথম সপ্তাহের কিস্তি এই রইল। 

*****

এক কথায় ২০১৬? 
শান্তিপূর্ণ।

২০১৬র রেজলিউশন রেখেছি কি? 
কিছু রেখেছি, কিছু রাখিনি।

২০১৭র জন্য নতুন রেজলিউশন নেব?
নিশ্চয়।

২০১৬য় এমন কী করেছি যা আগে কখনও করিনি?  
বাড়ির চশমা বাইরের চশমা আলাদা করেছি। 
নিয়মিত রান্না ধরেছি। 
কিছু পছন্দ না হলে (বই, সিনেমা, মানুষের সঙ্গ) সেটা থেকে উঠে চলে এসেছি। এবং বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ টের পাইনি। 

২০১৭য় কী থাকলে খুশি হব যা ২০১৬ এ ছিল না (কম ছিল)? 
আরেকটু ফোকাস। আরেকটু রুটিন। 

সবথেকে বড় সাফল্য?
বই পড়ার অভ্যেস ফিরিয়ে আনা। অবান্তরের বাইরে লেখার জন্য সময় বার করা। 

সবথেকে বড় ব্যর্থতা?
অবান্তরের বাইরের লেখার জন্য যতখানি সময় বার করতে পারা উচিত ছিল ততখানি না পারা।

২০১৬র প্রিয়তম বই?
স্টোনার। এখনও আরও ক'খানা বই পড়া হবে, তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত স্টোনার-এর থেকে ভালো আমার তাদের লাগবে না।

২০১৬র প্রিয়তম গান?
এটার উত্তর নেই। তবে অফিস বেরোনোর আগে রেডি হতে হতে সংগীত বাংলায় যে গানটা এলে মন ভালো হয়ে যাচ্ছে সেটা এইটা।  

আরও বেশি কী করা উচিত ছিল? 
বেড়াতে যাওয়া। অবশ্য উচিত বলব না কারণ ইচ্ছে বা আলসেমি করে যাইনি এমন নয়। যাওয়া সম্ভব ছিল না বলেই যাইনি। এ আক্ষেপ ২০১৭য় মেটাতেই হবে। 

কী আরেকটু কম করলেও চলত? 
গেমস খেলা। 

নিজের সম্পর্কে কী জানলাম? 
ডেডলাইন ছাড়া আমি ডেড। 

অন্যের সম্পর্কে? 
প্যাট্রোনাইজ করাটা আসলে একরকমের ডিফেন্স মেকানিজম। যারা এটা করে তারা আমার রাগ নয়, করুণার পাত্র।  

২০১৫র তুলনায় ২০১৬য় আমি
বেশি খুশি? মনে হয় না।
বেশি রিল্যাক্সড? মনে হয় না।
বেশি বড়লোক? একেবারেই না।
বেশি স্থিরলক্ষ্য? হ্যাঁ

নতুন বন্ধু হল?
না।

পুরোনো শত্রুর হাত থেকে মুক্তি মিলল? 
শত্রু থাকার মতো ইম্পরট্যান্ট লোক আমি নই, তবে অপছন্দের লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক/ যোগাযোগ রাখার দায় অনেক কম বোধ করেছি। 

২০১৬র সবথেকে সমীচীন পয়সা খরচ?
কিন্ডল

২০১৬র সবথেকে পয়সা নষ্ট?

এ বছরে আমি সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ? 
বিষয়টা ২০১৬র আগেও সত্যি ছিল। কিন্তু ২০১৬তেই আমি প্রথম বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন হলাম। আমার অনেক কিছু নেই, কিন্তু নিজের জন্য, নিজের ভালোলাগা কাজ বা অকাজের পেছনে ঢালার জন্য সময় আছে। সুযোগ আছে। আমার স্থানকালপরিস্থিতিতে থাকা বেশিরভাগ লোকেরই এটা নেই। এবং আমি এ জন্য আকণ্ঠ কৃতজ্ঞ। (তাঁদের না থাকার জন্য নয়, ইন ফ্যাক্ট, আমার আন্তরিক চাওয়া তাঁরা নিজেদের জন্য সময় পান। আমি কৃতজ্ঞ আমার সময় থাকার জন্য।) 

আর অর্চিষ্মানের জন্য তো বটেই। 


December 04, 2016

গেটাফিক্স, গ্রেটার কৈলাশ ১



আমার গেটাফিক্স-এর খাবার ভালো লেগেছে, সজ্জা ভালো লেগেছে, জানালা ভালো লেগেছে, জানালার ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে গায়ে এসে পড়া ডোরাকাটা রোদ্দুর ভালো লেগেছে, কর্তৃপক্ষের ব্যবহার ভালো লেগেছে, আমাদের আশেপাশে বসে খাওয়া বাবামাবাচ্চা, প্রেমিকপ্রেমিকা, বন্ধুবান্ধবদের ভালো লেগেছে, ওপেন কিচেনের ফাঁক দিয়ে দেখা যাওয়া শেফ আর সু-শেফদের ধপধপে সাদা জামা আর টুকটুকে লাল টুপি ভালো লেগেছে। আমার গেটাফিক্সের সব কিছু এত এত ভালো লেগেছে যে অদূর ভবিষ্যতে যে ক’দিনের জন্য আমার টেম্পোরারি প্রোষিতভর্তৃকা হওয়ার চান্স আছে, সে ক’দিন সময় পেলে এসে গেটাফিক্সের জানালার ধারের টেবিলটায় বসে কফি আর স্যালাড খেতে খেতে অবান্তর লেখার ইচ্ছে আছে। অবশ্য লেখা কত হবে কে জানে কারণ ওয়াই ফাই ফ্রি। 


আমার উত্তেজিত প্ল্যান শুনে অর্চিষ্মান চোখ ঘোরাল। ও জানে যে আমার ভালো লাগার কোনও মাত্রা নেই। খারাপ লাগারও না। ইন ফ্যাক্ট, গেটাফিক্সের দুর্দান্ত রিভিউ মারকাটারি রেটিং-এর কথা আমি অনেকদিনই জানতাম, কিন্তু কখনও যাওয়ার কথা ভাবিনি। কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম গেটাফিক্স আমার খারাপ লাগবে। ভীষণ খারাপ লাগবে। প্রথম খারাপ লাগবে লোকেশন। জি কে ওয়ান এন ব্লক মার্কেটে আমি যতবার গেছি, বাড়ি ফিরতে প্রাণান্ত হয়েছে। সে ওলা উবারের আগের জমানা। কোনও অটো পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় খারাপ লাগবে খাবার। গেটাফিক্সের ট্যাগলাইনের প্রথম শব্দ হচ্ছে ‘হেলদি’। অর্থাৎ ময়দার বদলে ভুষিওয়ালা আটা দিয়ে বানানো খসখসে বার্গার-বান, চোয়াল ব্যথা করা গ্লুটেন-ফ্রি পাস্তা আর ডিমের সাদার বিস্বাদ অমলেট। তিন নম্বর এবং সবথেকে বেশি খারাপ লাগবে ক্রাউড। পয়সা দিয়ে যাঁরা চিয়াসিড ছড়ানো পালংশাকের জুস আর ভেগান কেক খেতে যান তাঁদের টাইপ সম্পর্কে আমার একটা মতামত আছে এবং সেটা হচ্ছে . . . ওয়েল, তাঁরা আমার টাইপ নন এটুকু বলাই যথেষ্ট।

তবু গেলাম কেন? গেলাম শনিবার দুপুর বলে। বেয়াল্লিশ ঘণ্টা ছুটি হাতে থাকলে কোনওকিছুই খারাপ লাগে না, হতাশ হওয়ার সম্ভাবনায় ভয় লাগে না, লাগলেও সেটাকে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ বলে চালিয়ে নেওয়া যায়। সাবিত্রী ফ্লাইওভার সারানো হচ্ছে কে জানে কদ্দিন ধরে, রোজ ফেরার সময় বাড়ির নাকের ডগায় এসে আধঘণ্টা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকতে কান্না পায়, শনিবার দুপুরবেলা মনে হয় দেশের উন্নতির জন্য এটুকু কষ্ট করা আমার কর্তব্য। তার ওপর ওইরকম রোদ্দুর। তবু গেটাফিক্স আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল না। কিন্তু প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পছন্দের কোনওটাই যখন আমাদের ট্যাঁক এবং পছন্দসই দূরত্বের সীমার মধ্যে পড়ল না তখন স্থির হল গেটাফিক্সই সই।

জি কে ওয়ান মার্কেটের ভেতরের গলিতে গেটাফিক্স। ঢোকার সিঁড়িটা সরু, কিন্তু ঢুকে পড়লে চৌকো ছড়ানো বসার জায়গা, দেওয়ালে বিদেশী ক্যাফের ছবি, লাইটের ফিক্সচার যেন সে ক্যাফের সামনের রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট।


আমার থাই প্রন স্যালাড। লেটুস, হলুদ সবুজ লাল ক্যাপসিকাম, গ্রিলড পেঁয়াজ, মিষ্টি নোনতা আঠালো ড্রেসিং। যতটুকু দরকার ততটুকু। অন্য সবকিছুকে ডুবিয়ে মারছে না। তরিতরকারি সতেজ, লেটুস সজীব, মোটা মোটা চিংড়ির পরিমাণ ভদ্রলোকের মতো। প্রথমে ভেবেছিলাম ছুরি কাঁটাই তো যথেষ্ট আবার চামচ দিয়েছে কী করতে। তারপর যখন স্যালাডের শেষ লেটুসের পাতাটা মুখে পোরার পর গভীর প্লেটের নিচে খানিকটা ড্রেসিং পড়ে থাকতে দেখলাম, তখন বুঝলাম কেন। ভাগ্যিস চামচ দিয়েছিল, প্লেট কাত করে সেটুকু খেয়ে নেওয়া গেল। 


অর্চিষ্মানের বারিটো চিকেন বোল। ভাত, লাল (রাজমা) কালো বিনস, পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম, মিষ্টি ভুট্টার দানা, টমেটোকুচি, চিপোটলে মশলা মাখিয়ে গ্রিল করা মুরগির লেগপিস হাড় ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো করা। পাতিলেবুর রস। উনুনগরম। পাশে সাওয়ার ক্রিম আর সালসা। 

অন্তে দার্জিলিং উলং চা আর গাজরের কেক। ডিমহীন। চিনির বদলে গুড় আর মাখনের বদলে তিসির তেল দিয়ে বানানো। তাতে স্বাদ টসকেছে কেউ বলতে পারবে না। কেকের পাশে সম্ভবত বেরিজাতীয় কোনও ফলের রস। চিনিহীন।

খুঁত ধরতেই হবে? তবে বলি জলের জাগে কমলালেবুর টুকরো ভাসিয়ে রাখার আইডিয়াটা আমার ভালো লাগেনি। আমি যখন জল খেতে চাই তখন বিস্বাদ, বোরিং জলই খেতে চাই। কমলালেবু খেতে চাইলে সফলের দোকান থেকে কমলালেবু কিনে খাব। 

জীবনে দু’রকম হেলদি খাবার দেখেছি। একরকম হচ্ছে গাঁদাল পাতার ঝোল আর বার্লি। স্বাস্থ্যে টইটম্বুর, স্বাদে অকথ্য। দ্বিতীয়রকম হেলদির উদাহরণ হল গরম ভাত, মুসুর ডালের সঙ্গে পটলভাজা আর কাঁচালংকা কালোজিরে দেওয়া রুইমাছের ঝোল। ভালো খেতে কিন্তু স্বাদটা পয়েন্ট নয়, পয়েন্ট হল আরামটা। কুলকুচি করে জিভ থেকে স্বাদ মুছে ফেলার পরও যেটা অনেকক্ষণ বুক ভরিয়ে রাখবে। 

ভুল প্রমাণিত হয়ে এত খুশি জীবনে কমই হয়েছি। 

গেটাফিক্সের হেলদি খাবার এই দ্বিতীয় রকমের হেলদি। পেট তো ভরেই, মন ভরে তার থেকেও বেশি। কাছাকাছি থাকলে অবশ্য যাবেন।


December 03, 2016

সাপ্তাহিকী



Based on the experience of my life, which I have not exactly hit out of the park, I tend to agree with that thing about, If it's not broke, don't fix it. And would go even further to: Even if it is broke, leave it alone, you'll probably make it worse.
                                                       ---George SaundersTenth of December

প্রাণ বাঁচাতে আফ্রিকান হাতিরা অবশেষে নিজেদের দাঁত ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  




" . . . with a uniform, there’s less thinking, and, in a way, more reverence, whether it’s hoodies or pinstripes. রেভারেন্সের কথা জানি না, আমি অফিসে প্রায় এক জামাকাপড় পরে যাওয়া পছন্দ করি ওই ‘লেস থিংকিং’ অংশটুকুর জন্য। 


সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে অর্চিষ্মানের সঙ্গে আমাদের দুজনের প্রথম সাবওয়ে স্যান্ডউইচ অর্ডারের দুঃস্বপ্ন নিয়ে কথা হচ্ছিল। আর সেদিনই বাড়ি এসে এটার খোঁজ পেলাম। আমার সাবওয়ে অর্ডার থেকে আমার বয়স এবং চুলের রং ধরে ফেলার কুইজ। আমাকে এরা বলছে, You’re 26 years old with red hair. 

ছবি দেখে ‘পান’ ধরতে পারবেন? আমি কয়েকটা পেরে ভয়ানক খুশি হয়েছি।

অনেকদিন বাদে আবার গান শুনছি। যাঁর সুরে আপাতত ডুবে আছি তাঁর একখানা গান এই রইল। 


November 30, 2016

গোয়েন্দাগল্পের কয়েকটি অবগুণ



সুখীদুঃখী পরিবার নিয়ে টলস্টয়ের আনা কারেনিনার ওপেনিং লাইনটা একটু অদলবদল করে গোয়েন্দাগল্পের ক্ষেত্রেও চালিয়ে দেওয়া যায়। সব ভালো গোয়েন্দাগল্পই একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র (ইন ফ্যাক্ট, এই স্বাতন্ত্র্যই তাদের ভালোত্বের একটা বড় লক্ষণ), কিন্তু সব বাজে গোয়েন্দাগল্পই একরকম। একরকম বলতে আমি প্লট বোঝাচ্ছি না, আমি বলছি কিছু অবগুণ বা দোষের কথা। যে ক’টা বাজে গোয়েন্দাগল্প এ বছর পড়লাম তাদের সবকটিতেই দোষগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। 

কিন্তু আমি বাজে গোয়েন্দাগল্প পড়লাম কেন? পড়লাম একটা খামতি পূরণ করার জন্য। আমি গোয়েন্দা গল্প ভালোবাসি, কিন্তু সে ভালোবাসার অনুপাতে পড়েছি কি? বছরের শুরুতে স্টক নিলাম। খুচরোখাচরা ছেড়ে যে সব লেখকের লেখা ধরে পড়েছি তাঁদের মধ্যে আছেন আদিযুগের কোনান ডয়েল, পো। স্বর্ণযুগের ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ার্স, চেষ্টারটন, মার্জারি অ্যালিংহ্যাম, জোসেফাইন টে, নাইয়ো মার্শ। তার পরের যুগের, যেটাকে রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্যের টাইমলাইন সাইটে কনটেম্পোরারি বলে, সেখানকার রুথ রেন্ডেল, পি ডি জেমস, কলিন ডেক্সটার। আর সমসাময়িকদের মধ্যে অ্যান ক্লিভস, এলিজাবেথ জর্জ, শম্পার বদান্যতায় চার্লস ফিঞ্চ আর জেসন গুডউইন আর অফ কোর্স, রবার্ট গ্যালব্রেথ। (বাংলা গোয়েন্দাগল্প, গোয়েন্দাগল্প ভালো না বাসলেও স্রেফ বাংলায় লেখা হয়েছে বলেই পড়া হত, তাই সেগুলো বাদ দিচ্ছি।)

লিস্টের দিকে তাকালেই কয়েকটা ব্যাপার লাফ মেরে চোখের সামনে দাঁড়ায়। এক, আমার গোয়েন্দাগল্প পড়ার দৌড় নির্লজ্জরকম পশ্চিমমুখী। এ খুঁত অবিলম্বে সারানো দরকার। দু’হাজার সতেরোর আমার একটা রেজলিউশন, ননককেশিয়ান লেখকের ননককেশিয়ান গোয়েন্দার স্টক বাড়ানো। দ্বিতীয়, আমার মনোযোগের সিংহভাগ দখল করে রেখেছেন মহিলা লেখকরা। এটাকে অবশ্য আমি ঠিক সমস্যা বলব না, তবু একরকমের পক্ষপাতিত্ব তো বটেই। কিন্তু আমার মতে গুরুতর হচ্ছে তিন নম্বর সমস্যাটা। সমকালীনই রহস্য সাহিত্যে কী ঘটছে, সে কোন পথে চলেছে, সে সম্পর্কে আমি ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আর তা যদি না থাকে তাহলে নিজেকে গোয়েন্দা গল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জাহির করতে বিবেকে বাধে। 

সে বাধা কাটাতে এ বছরের আমার গোপন রেজলিউশনের একটা ছিল আমার জীবৎকালে, বা আরও ভালো হয় গত পাঁচ দশ বছরে, লেখা গোয়েন্দাগল্প পড়ে দেখা। মেনস্ট্রিম গোয়েন্দাগল্প। আগাথা ক্রিস্টি নিজের সময়ে যা ছিলেন, একেবারে মূল ধারার, সেই ধারাটার সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করা। সেটা করতে গিয়ে বুঝলাম সিলেবাস যা জমেছে এক বছরে তা মেক আপ দেওয়া অসম্ভব। শুধু ইংরিজি গোয়েন্দাগল্পই বছরে হাজারখানেক করে বেরোয়। কাজেই চাল টিপে ভাত বিচার ছাড়া রাস্তা নেই।

শুনলে মনে হবে আমি যেন দাঁড়িপাল্লা আর কষ্টিপাথর নিয়ে নেমেছিলাম, সে রকম একেবারেই নয়। নতুন গোয়েন্দাগল্প পড়ার ইচ্ছেটা জেনুইন ছিল। কারণ ভালোবাসাটাও জেনুইন। বুকটিউব আমার বই পড়ার ভোল পাল্টে দিয়েছে (সেটা যে পুরোটাই ভালো হয়েছে তেমন নয় কিন্তু সে নিয়ে পরে বলব) কাজেই আমি ভাবলাম গোয়েন্দাগল্পের ব্যাপারে ওঁরা কী বলেন দেখা যাক। হতাশ হলাম। রহস্যঘরানার প্রতি উৎসর্গীকৃত চ্যানেলের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকমের কম। তবে ক্রাইম অ্যান্ড থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে প্রচুর ব্লগ আছে। সেগুলো টপাটপ ফিডলিতে পুরে ফেললাম। তারপর মন দিয়ে তাঁদের রিভিউ আর সাজেশন পড়তে লাগলাম। কয়েকটা নাম বারবার চোখে পড়ল। লুইস পেনি, ট্যানা ফ্রেঞ্চ, চার্লস টড। এঁরা বছর বছর বেস্টসেলার বাজারে ছাড়েন। আবার কারও কারও নাম চোখে পড়ল যাঁরা লিখেছেন মোটে একটা বই এবং মাত করেছেন। যেমন সুইস লেখক জোয়েল ডিকার। 

সে সব বইয়ের কথা এ মাসের বইতে নেই কেন? কারণ সে সব বইয়ের রেঞ্জ ‘পাতে দেওয়া যায় না’ থেকে শুরু করে ‘চলতা হ্যায়’। কয়েকটা পড়তেই এত কষ্ট হয়েছে যে তাদের নিয়ে লেখার যন্ত্রণা নিজেকে দেওয়ার সাহস হয়নি। 

তবু আমার আফসোস নেই। আমি বিশ্বাস করি বাজে বই পড়া প্রায় ভালো বই পড়ার মতোই জরুরি। তাছাড়া বাজে গোয়েন্দাবই পড়েই তো সেই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিটা হল যেটা শুরুতেই লিখলাম। ভালো বই সব নিজের নিজের মতো, বাজে বই সব একরকম। 

বাজে বইদের যে কমন দোষগুলো আমার চোখে পড়ল সেগুলো নিয়েই আজকের পোস্ট। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা দোষ যে কোনও লেখার পক্ষেই প্রযোজ্য। তবে এটাও সত্যি, অন্য ধারার গদ্যে যে খুঁতগুলো চাপা দেওয়া অনেক সহজ, গোয়েন্দাগল্পে, যেখানে প্লটটাই মোদ্দা কথা, সেখানে এসব চাপা দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। এই দোষগুলো বাজে গোয়েন্দাগল্পে অনেক বেশি থাকে, কিন্তু কিছু কিছু ভালো গোয়েন্দাগল্পেও থাকে। সে সব গল্পের দুয়েকখানার নামও সততার খাতিরে আমাকে উল্লেখ করতেই হল।

আমি কি এই সব খুঁতহীন লেখা লিখে দেখিয়ে দিতে পারব? মোটেই না। তাহলে অন্যের খুঁত ধরার অধিকার পেলাম কোত্থেকে? এর দুটো উত্তর হয়। মিথ্যে উত্তরটা হচ্ছে, সেখান থেকেই পেলাম যেখান থেকে প্রশংসা করার অধিকার পাই। আর সত্যি উত্তরটা হচ্ছে আমার অধিকার এসেছে, আজকাল বেশিরভাগ অধিকার যেখান থেকে আসে, সস্তা ইন্টারনেট আর কাজের অভাব থেকে। 

*****

১। আমার গোটা ব্লগটা যে ব্যাপারটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অধিকাংশ বাজে গোয়েন্দাগল্পই সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে। অবান্তরতার ফাঁদ। অবান্তরতা দু’ভাবে আসতে পারে। এক, দৃশ্যের মাধ্যমে, দুই, চরিত্রের মাধ্যমে। অবান্তর দৃশ্য হচ্ছে যে দৃশ্য প্লট এগোতে সাহায্য করে না। যে সব দৃশ্য পাতা উল্টে গেলেও গল্পটা আপনি সম্পূর্ণ বুঝতে পারবেন। অবান্তর চরিত্র চিহ্নিতকরণেরও একই পদ্ধতি। চরিত্রটা বাদ দিয়ে দিলে গল্পের যদি কিছু যায় না আসে তবে সেটা অবান্তর চরিত্র। কাজেই পরিত্যাজ্য। 


একটাদুটো থাকলে তবু সহ্য হয়, লুইস পেনির আরম্যান্ড গামাশ সিরিজে এই রকম চরিত্র এবং দৃশ্যের গাদাগাদি ঠেলাঠেলি ভিড়। আরম্যান্ড গামাশ হচ্ছেন কানাডার কিউবেক পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর। শার্লক হোমসের যেমন লন্ডন, মিস মার্পলের যেমন সেন্ট মেরি মিড, ইন্সপেক্টর বার্নাবির যেমন মিডসমার, আরম্যান্ড গামাশের তেমন ‘থ্রি পাইনস’। কিউবেকের একটি অত্যন্ত ছোট, কাল্পনিক গ্রাম। এই থ্রি পাইনস-এ কয়েকজন বাঁধা বাসিন্দা আছেন। তাঁরা সব গল্পেই থাকেন। সে গল্পের প্লটে তাঁদের উপস্থিতির দরকার থাকুক আর না থাকুক। আর যেহেতু তাঁরা থাকেন, তাঁদের ফুটেজ দিতেই হয়। অর্থাৎ অবান্তর দৃশ্য। গামাশ সিরিজের একজন একজন চরিত্র হচ্ছেন রুথ, প্রাইজ পাওয়া কবি। আমি প্রায় হাফ সিরিজ (ছ-সাতটা উপন্যাস) পড়ে ফেলেছি, কোনওটায় রুথের থাকার কোনও কারণ পাইনি। (রুথ একলা নন, এরকম আরও একগাদা চরিত্র আছেন এই সিরিজে)। কোনও গল্পেই তিনি খুনি নন, গোয়েন্দা নন, সহকারী নন, রেড হেরিং নন, ভিকটিম নন। অথচ প্রতি গল্পে তিনি আছেন। এবং ফেলুদায় শ্রীনাথ কিংবা ব্যোমকেশে পুঁটিরামের মতো নেপথ্যচারীর মতো করে নয়, রুথ আছেন সদর্পে। গল্পের মোড়ে মোড়ে রুথকে লেখক কবিতার খাতা খুলে বসিয়ে দিয়েছেন। এমনও নয় সে সব কবিতার মধ্যে ক্লু লুকিয়ে আছে। ওই সব দৃশ্যের একমাত্র উদ্দেশ্য রুথের (বেসিক্যালি, লুইস পেনির, কারণ কবিতাগুলোও তিনিই লিখছেন) কবিত্ব প্রমাণ। 

অবগুণ বলছি বটে, কিন্তু এই অবগুণের উদ্দেশ্যটা মহৎ। অবান্তর চরিত্রের অবতারণা করা হয় পারিপার্শ্বিক ফুটিয়ে তোলার জন্য, আর অবান্তর দৃশ্যের অবতারণা করা হয় এই সব অবান্তর চরিত্রগুলোকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য। বেস্ট হয় এই দুটো কাজই গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে করতে পারলে। ভয়ানক শক্ত ব্যাপার। কিন্তু ভালো গোয়েন্দাগল্প লেখা সহজ তো কেউ বলেনি। 

২। লেখকের পক্ষপাত। অথরব্যাকড রোল সিনেমাথিয়েটারে দেখতে যত ভালো লাগে, গোয়েন্দা গল্পে ততটা নয়। গোয়েন্দা বা তার সাঙ্গোপাঙ্গর প্রতি লেখকের পক্ষপাত চলতে পারে, তার বাইরে চালাতে গেলে বিপদ। এর উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে শীর্ষেন্দুর শবর সিরিজের কয়েকটা গল্প মনে আসছে। ঈগলের চোখ-এর বিষাণ চক্রবর্তীর কথা মনে করুন। মারাত্মক ইন্টারেস্টিং চরিত্র। স্বভাব বিশৃঙ্খল, মুখে দর্শনের খই, চেহারা যৌন আবেদনে টইটম্বুর। একই সঙ্গে অপরচুনিটি আর মোটিভের দিক থেকে সন্দেহভাজনদের লিস্টের একেবারে মাথায় বিষাণের নাম। কিন্তু গল্পের গোড়া থেকেই গোয়েন্দা শবর এবং লেখক শীর্ষেন্দুর নেকনজর বিষাণের প্রতি। যত ভাবগম্ভীর ডায়লগ তার মুখে। শবরও সহকারীর কাছে একান্তে বিষাণের প্রতি সমব্যথা প্রকাশ করেন যখনতখন। একচোখোমিটা এতই প্রকট যে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে ধরে নেওয়া যায় যে একে জেলে পোরা লেখকের কলজেতে কুলোবে না। অর্থাৎ এ খুনি নয়। মোটিভ, অপরচুনিটি থাকা সত্ত্বেও স্রেফ লেখকের পক্ষপাতদুষ্টতার জন্য একজনকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। 

৩। পাঠকের বীতরাগ। লেখক নিজে কাউকে ভালোবাসবেন না ঠিকই, তা বলে কোনও চরিত্রকে অকারণে পাঠকের বিতৃষ্ণার পাত্র করে না তোলাই ভালো। ভিলেনকে করলে তবু একটা বোঝা যায়। কিছু কিছু গল্পে স্বয়ং গোয়েন্দা এত বিরক্তিকর হন, ভাবা যায় না। গোয়েন্দা বা প্রধান চরিত্রের প্রতি কেন পাঠকের নেকনজর থাকা উচিত তার একটা কারণ আমার মনে হয়, তাতে গল্পে ঢুকতে পাঠকের সুবিধে হয়। মিস মার্পল, ফেলুদা কিংবা পোয়্যারোকে যেহেতু আমি পছন্দ করি, তাঁদের গল্প খারাপ হলেও আমার পড়তে অসুবিধে হয় না। আমার চেনা অনেক লোকের ‘গার্ল অন্য দ্য ট্রেন’ ভালো লাগেনি মূলত গল্পের প্রধান চরিত্র ‍র‍্যাচেলকে ভালো লাগেনি বলে। গিলিয়ান ফ্লিন-এর গন গার্ল আমার ভালো লাগেনি। আমি যদি গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র নিক ডান-এর প্রতি আরেকটু সমব্যথা জোগাড় করতে পারতাম তবে ভালো লাগলেও লাগতে পারত। 

অফ কোর্স, পছন্দঅপছন্দের কথা তুললেই ব্যাপারটা ব্যক্তিগত হয়ে যায়। আমার উদাসীনতা ভালো লাগে না, কারও আবার ওইটাই ইরেজিস্টেবল লাগে। আমার চেনা কারও কারও দীপকাকুকে পছন্দ ওঁর ওই নিভুনিভু ব্যক্তিত্বের জন্যই। দীপকাকুর মতো একেবারেই নন হয়তো, দীপকাকু প্রাইভেট, ইনি পুলিশ, দীপকাকুর প্রেম নেই (থাকলেও আমরা জানি না), ইনি গল্পে গল্পে একেক নারীর প্রেমে পড়েন কিন্তু একটাও প্রেম করে উঠতে পারেন না, তবু দীপকাকুর কথা উঠলেই আমার কলিন ডেক্সটারের ইনস্পেক্টর মর্স-এর কথা মনে পড়ে। বলাই বাহুল্য, ভদ্রলোক আমার গুডবুকে নেই। 

ভালো লাগতে গেলে গোয়েন্দার প্রতি মনোভাব যে অনুকূলই হতে হবে এমন নয়। জাস্ট কৌতূহল অনেক সময় ভালো কাজ দেয়। গার্ল অন দ্য  ট্রেন-এর র‍্যাচেলকে ভালোলাগানো শক্ত, কিন্তু আমি মহিলার প্রতি কৌতূহলী ছিলাম। রবার্ট গ্যালব্রেথের করমোরান স্ট্রাইককে আমার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু আমি লোকটার প্রতি কৌতূহলী। সে কেস সমাধান করতে পারল কি না তাতে আমার একটা কৌতূহল আছে। যুদ্ধফেরৎ বিকলাঙ্গ গোয়েন্দা, রকস্টার বাবার অবৈধ সন্তান। অন্যরকমত্বের ডিপো। কম শক্তিশালী কোনও লেখকের হাতে পারলে চরিত্রটা ক্যারিকেচার হয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা ছিল। আমি কৌতূহলী জেসন গুডউইনের গোয়েন্দা ইয়াশিমের প্রতি। ইয়াশিমের যৌনপরিচয়, তাঁর রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ, সবথেকে ইন্টারেস্টিং হল সে সময়ের ওটোমান সাম্রাজ্যের রাজারাজড়াদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা গলাগলি। 


তবে প্রেক্ষাপট ইন্টারেস্টিং হলেই যে গোয়েন্দা ইন্টারেস্টিং হয় না তার প্রমাণ রেখেছেন চার্লস টড তাঁর বেস ক্রফোর্ড সিরিজে। চার্লস টড হচ্ছেন অ্যামেরিকার মা (ক্যারোলিন টড) আর ছেলের (চার্লস টড) লেখক জুটি। এঁদের গোয়েন্দা হলেন বেস ক্রফোর্ড, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন নার্স। বুঝতেই পারছেন, প্রেক্ষাপট রোমহর্ষক। বেস সিরিজের যে গল্পটা আমি প্রথম পড়েছি, অ্যান ইমপার্শিয়াল উইটনেস, সেখানে দেখা যাচ্ছে একজন মৃত সৈনিকের সংগ্রহের একটি ছবির সূত্র ধরে বেস একটি রহস্যের খোঁজ পান এবং সমাধানে লেগে পড়েন। চার্লস টডের লেখা একেবারে প্রথম দরের নয়, তাছাড়া যে টেকনিক্যাল গলদগুলোর কথা ওপরে বললাম সে সবেরও কিছু কিছু আছে। কিন্তু বেস ক্রফোর্ড সিরিজের প্রধান খামতি বেস নিজে। সাহসী এবং স্বাধীন মহিলা চরিত্র লিখতে গিয়ে একটা ট্রোপ বারবার লেখকরা ব্যবহার করেন, গোয়েন্দা অগোয়েন্দা নির্বিশেষে, সেটা হচ্ছে চরিত্রটিকে প্লেন ঝগড়ুটে বানিয়ে ফেলা। এ কথাটা বলার সময় আমি মাথায় রাখছি যে  ‘সুললিত ব্যক্তিত্ব’ কোটার নম্বরটা মেয়েদের ক্ষেত্রে ওয়েটেজ অনেক বেশি পায়। তাছাড়া সে যুগ পুরুষসর্বস্ব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য ও গুরুত্ব আদায় করতে গেলে পাপোশ হয়ে থাকলে যে চলত না সেটা নিয়েও আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই সব মাথায় রেখেও বেসকে ইরিটেটিং বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি।

৪।  শুনেছি নিয়ম না ভাঙলে গ্রেট হওয়া যায় না। কিন্তু গুড হতে গেলে কিছু নিয়ম মানা দরকার বলেই আমার বিশ্বাস। গোয়েন্দাগল্পের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে।  যেমন It must baffle a reasonably intelligent reader. (Raymond Chandler)  কিংবা  There simply must be a corpse in a detective novel, and the deader the corpse the better. (S. S. Van Dine) এ সব নিয়ম আপেক্ষিক, এগুলো নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু তর্কাতীত কিছু টেকনিক্যাল নিয়মও আছে, যেমন যাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হবে তার সঙ্গে পাঠকের যথেষ্ট আলাপপরিচয় তৈরি করা। শেষ পাতায় গিয়ে হুড়মুড়িয়ে সব ব্যাখ্যা না দেওয়া। হ্যানসেল গ্রেটেলের মতো গল্পের পথে পাউরুটির গুঁড়োর মতো ক্লু ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া, যাতে পাঠকরা নিজেরা রহস্য উন্মোচনের অন্তত অ্যাটেম্পট নিতে পারেন ইত্যাদি।


আরও একটা নিয়ম আছে, যেটাকে যে নিয়মের মধ্যে গণ্য করা দরকার সেটা আমার মাথাতেই আসেনি। ট্যানা ফ্রেঞ্চ-এর ডাবলিন মার্ডার স্কোয়্যাড সিরিজের প্রথম গল্প ‘ইন দ্য উডস’ না পড়লে আসতও না। হাঁটার নিয়ম যেমন একপায়ের সামনে আরেক পা ফেলা, খাওয়ার নিয়ম যেমন চিবোনোর পর গলাধঃকরণ, শত্রু কম রাখার নিয়ম যেমন মুখ বুজে থাকা তেমনি গোয়েন্দাগল্পের একটা বেসিক নিয়ম হচ্ছে যে সমস্যাটা দিয়ে গল্পটা শুরু হচ্ছে শেষে গিয়ে সে সমস্যার সমাধান পাঠকের গোচরে আনা। ‘ইন দ্য উডস’ শুরু হয় তিনটি বাচ্চার গল্প দিয়ে। দু’পাতার পূর্বরাগে চমৎকার ভাষায় লেখক এক বিকেলের বর্ণনা দেন, যখন পাড়ার তিনটি বাচ্চা খেলতে খেলতে গ্রামের পাশের বনে ঢুকে পড়ে আর ফিরল না। সারা সন্ধ্যে মাঝরাত পেরিয়ে শেষমেশ পাড়ার লোক আর স্থানীয় পুলিশ তিনজনের একজনকে খুঁজে পেল। ভয়ে প্রায় পাথর, গাছে পিঠ ঠেকে গেছে, নখ ঢুকে গেছে গাছের ছালে। ভয়ের এরকম জেনেরিক বর্ণনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি লেখক, একটি কৌতূহলোদ্দীপক ক্লু-এরও উল্লেখ করেছেন। ছেলেটির মোজাও নাকি রক্তে ভেজা ছিল। এক, সেটা মানুষের রক্ত। দুই, সেটা তার নিজের রক্ত নয়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ আর পরীক্ষানিরীক্ষার পর পুলিশ আর ডাক্তার দু’দলই মেনে নেন যে ছেলেটির স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। ওই রাতের ঘটনা ছেলেটির মাথা থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। 

পরের চ্যাপ্টার শুরু হচ্ছে এর আঠেরো (নাকি কুড়ি? ভুলে গেছি। এত কথা যে মনে আছে তাতেই আমি ইমপ্রেসড) বছর পর। সেই খুঁজে পাওয়া ছেলেটি এখন পুলিশে চাকরি করে। দু’তিন পাতার মধ্যেই একটা কেস আসে থানায়। সেই বনে, যেখানে তার দুই বন্ধু চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিল, একটি মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে। পড়েই আপনি নড়েচড়ে বসছেন নিশ্চয়, এতদিনে তবে সেই রহস্যের সমাধা হবে। তদন্ত শুরু হল। স্বাভাবিক ভাবেই, তদন্ত চালাতে গিয়ে ছেলেটির মাথায় বারবার সেই রাতের টুকরোটুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে, মানসিক বিচলন, দুঃস্বপ্ন হ্যানাত্যানা। বর্তমান তদন্তটা একেবারে জোলো, কিন্তু আপনি আশা ছাড়ছেন না। আপনি ভাবছেন এক্ষুনি ছেলেটির হারানো স্মৃতি ফিরে আসবে। এই জোলো খুনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ওই রোমহর্ষক অন্তর্ধানের চাবিকাঠি। এগোতে এগোতে গল্প একসময় ফুরিয়ে গেল। কুড়ি বছর আগের রাতে কী ঘটেছিল অজানাই রয়ে গেল। পুলিশ হিরো দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আপনি বইখানা ছুঁড়ে ঘরের কোণে।

গোয়েন্দাগল্পের সব নিয়মের বড় নিয়ম হচ্ছে It must be honest with the reader. (আবারও Raymond Chandler)। আমার মতে ট্যানা ফ্রেঞ্চের ইন দ্য উডস সে নিয়মটাই ভাঙে। এক (ভালো) রহস্যের গাজর নাকের সামনে ঝুলিয়ে সম্পূর্ণ অন্য (পচা) রহস্য চালায়। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হচ্ছে সিরিজ বেচার ফন্দি। মোজার রক্তের উৎস ধাওয়া করতে আপনি পরের বই, তার পরের বই, তার পরের বই এই করে গোটা সিরিজ কিনবেন। অন্তত প্রকাশকের (লেখকেরও কি নয়?) তেমনই আশা। অন্যদের কথা জানি না, এ সব ফন্দিটন্দি দেখলে পড়ার ইচ্ছে আমার যত দ্রুত অন্তর্হিত হয় তত দ্রুত আর কিছুতে হয় না। 

*****

অবান্তরের পাঠকদের কাছে আমার অনুরোধ, যদি নতুন গোয়েন্দাগল্প কোনও ভালো লেগে থাকে, তাহলে আমাকে জানাবেন। ভালো লাগা খারাপ লাগা পরের ব্যাপার। পড়া তো হবে।

(ছবির উৎস গুগল ইমেজেস)



November 27, 2016

সাপ্তাহিকী



শিল্পীঃ Eric Standley. শিল্পীর আরও কাজের নমুনা এখানে দেখতে পাবেন। 

It is is better to know one book intimately than a hundred superficially. 
                                                   ---Donna Tartt, The Secret History


1) “Us” and “Them” 2) Obey orders 3) Do “them” harm 4) “Stand up” or “Stand by” 5) Exterminate. Five steps to tyranny.


নেদারল্যান্ডের ট্যুরিজম স্লোগানটা আমার দারুণ লেগেছে। দ্য অরিজিন্যাল কুল। আমাদেরটাও খারাপ না, ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া। অন্য সব দেশের ট্যুরিজম স্লোগান জানতে হলে এই ম্যাপটা দেখুন। 


ক্লিক ক্লিক ক্লিক। আমরা যখন ব্রাউজ করি তখন ব্রাউজার আমাদের সম্পর্কে কী কী ধরে ফেলতে পারে জানাটা বেশ আননার্ভিং

এন্ডলেস মেমোরি। যা যা ঘটেছে জীবনে কিছুই না ভোলা। গিফট কেন হতে যাবে বালাই ষাট, এর থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু নেই। 

অন্য কোনও উদ্দেশ্য থাকলে দৌড়তেই পারেন। কিন্তু ফিটনেসের মোক্ষলাভে, হাঁটু মাটি করা ছাড়া দৌড়ের আর বিশেষ ভূমিকা নেই।

ইলেকট্রিক গাড়ি এত নিঃশব্দে চলে যে যখনতখন লোকে চাপা পড়তে পারে। আদালত বলেছে যে এবার থেকে গাড়িতে আওয়াজ করা বাধ্যতামূলক।

জিরাফ আমার অন্যতম প্রিয় জন্তু। লম্বাটে গড়ন, শান্ত চোখ। ওদিক থেকে একদল জিরাফ আসছে। এদিক থেকে একটা জিরাফ যাচ্ছে। এদিকটার জিরাফটার চালচলন বিশেষ ভালো না। ক্যাসানোভা বলা যায়। ওর ইচ্ছে ওদিক থেকে আসা জিরাফগুলোর সবাইকে চুমু খায়। এদিকের জিরাফের একটাই রিডিমিং গুণ, বাছবিচার নেই, যে আসবে তাকেই চুমু খাবে। সমস্যা হল ওদিক থেকে আসা জিরাফদের একেকজনের গলা একেক দৈর্ঘ্যের। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে ক্যাসানোভা জিরাফের গলা দরকার মতো বাড়ানো কমানো যাতে সে একটাও চুমু মিস না করে। 


ব্যাম্বু বোট, গুরগাঁও



কালকের মতো সুন্দর সকাল দিল্লিতে কমই আসে। ঝকঝকে রোদ। পিঠের শাল ভেদ করে ঠিক ততটুকুই তাপ আসছে যতটুকু দরকার। বারান্দায় দাঁড়ালে সজনে গাছের হাওয়ায় গা শিউরোচ্ছে। আউটিং-এর জন্য পারফেক্ট। 

আউটিং-এর কথা সবাই জানত। আমরাই, অর্চিষ্মান ভুরু কোঁচকাচ্ছে, আচ্ছা, আমরা নয়, আমিই জানিয়েছিলাম। সেলফ হেল্প গুরুরা বলেন সাফল্যের একটা শুরুর শর্ত হচ্ছে অ্যাকাউন্টেবিলিটি। অর্থাৎ তুমি যদি পাঁচটা লোককে বল যে তুমি এবার থেকে রোজ দু’ঘণ্টা করে লিখবে, তাহলে লোকের কাছে মুখরক্ষার জন্যই দু’ঘণ্টা না হোক, আধঘণ্টা করে লিখতে বসা হবে। নিজের কাছে প্রমিস করে কিছু হয় না। নিজেকে নিজে বললে, আজ থেকে রোজ দু’ঘণ্টা লিখব, তারপর ভোরবেলা উঠে গা মুচড়ে বললে, আজ মনটা ভালো নেই, বড্ড পেট কামড়াচ্ছে, আজ থাক, কাল থেকে হবে। প্রমিস। ‘নিজে’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। 

গত ক’মাস ধরে নিজেদের কাছে কতবার যে বেড়াতে যাওয়ার প্রমিস করলাম। সকালে অফিস যাওয়ার পথে উইকএন্ড ডেসটিনেশন ফ্রম ডেলহি দেখতে দেখতে গেলাম। বাড়ি এসে ইন্ডিয়ান রেলের সাইট ঘাঁটলাম। শতাব্দীর কোন কোচে কবে কত সিট খালি মুখস্থ হয়ে গেল। যাওয়া হল না।

সব গিয়ে যখন কালকের আউটিং স্থির হল, আমি পত্রপাঠ ফোন করে বলে দিলাম। তিন্নিকে, মাকে। যে শনিবার আমরা বেড়াতে যাচ্ছি। মা সক্কাল সক্কাল ফোন করে মনে করালেন, ‘কী সোনা, আজ তোমাদের আউটিং তো? সাবধানে যেও। স্টাইল করতে গিয়ে টুপি বাদ দিও না।’

তারপর সাবধানে, পাছে মেয়ের পার্সোনাল স্পেসে পা দিয়ে ফেলেন, বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস সোনা? নাকি সিক্রেট?’ আমি বললাম, ‘এই তো সিনেমা দেখে খেয়ে ফিরব।’ মা দু’সেকেন্ড পর বললেন, ‘ওহ, আমি ভাবলাম অনেক দূর যাচ্ছিস বুঝি।’ 

ন’টা পঞ্চাশে সত্যম নেহরু প্লেসে শো, সিনেমার নাম অ্যারাইভাল। একেকসময় এমন হয় একটাও পছন্দসই সিনেমা আসে না। আর এখন ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট না অ্যারাইভ্যাল, কোনটা দেখব ঠিক করতে গলদঘর্ম। শেষপর্যন্ত বর্ণনায় বুদ্ধি করে ‘সাইফাই’এর সঙ্গে ‘মিস্ট্রি’ জুড়ে দেওয়ায় অ্যারাইভ্যাল জিতল। ফাঁকা হলে বসে পপকর্ন খেতে খেতে দু’ঘণ্টা কাটালাম। অ্যারাইভ্যাল আমাদের দুজনেরই ভালো লেগেছে। এ রকম সাইফাই সিনেমার একটা বোনাস ভালোলাগার ব্যাপার হচ্ছে কে ঠিক বুঝেছে আর কে ভুল সেটা নিয়ে টাইমপাস করা যায়। টুইটারে যে সব সেলিব্রিটি সিনেমা দেখে এসে একশোচুয়াল্লিশ বর্ণে সিনেমার গল্প না বলে থাকতে পারেননি তাঁদের বুদ্ধির দৌড় নিয়েও হাসাহাসি করা যায়। 

ভেবেছিলাম গুরগাঁও পর্যন্ত যেতে যেতে মাঝপথে কথা ফুরিয়ে যাবে, তাই একবার মনে হয়েছিল ব্যাগে দু’খানা বই ভরে নেব। একে অপরকে সিনেমার মানে বোঝাতে বোঝাতে আর সেলেব্রিটিদের নিয়ে হাসাহাসি থামতে থামতে দেখি অর্ধেক রাস্তা ফুরিয়ে গেছে। গুরগাঁও থেকে বহু লোকে দিল্লিতে রোজ চাকরি করতে আসে এবং ফিরে যায়। যারা যায় না তাদের কাছেই দূরত্বটা মনে হয় অনতিক্রম্য। ইদানীং জোম্যাটোতে পছন্দসই অনেক দোকানের ঠিকানাই গুরগাঁও দেখি। অনেক দূর বলে সরিয়ে রাখি।

সময়পুর বদলি-র মতো চমৎকার নামওয়ালা ষ্টেশন থেকে ইয়েলো লাইনের মেট্রো যায় হুডা সিটি সেন্টারমার্কা বদখত নামওয়ালা ষ্টেশনে। আমাদের মেট্রোটা অবশ্য একেবারে হুডা সিটি সেন্টার যায়নি, কুতুবমিনার ষ্টেশনে শেষ হয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম থেকে দিগন্তে জঙ্গলের মাথার ওপর জেগে থাকা কুতুবমিনারের তিনটে থাক দেখে ফোন তাক করলাম। করতে না করতেই পেছনে গুমগুম শব্দ, পাশের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকে গেছে। অর্চিষ্মান কনুই ধরে টান মারল, কোনওমতে স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে ছুটলাম। দুটো করে সিঁড়ি টপকে নেমে দুটো করে সিঁড়ি টপকে উঠে ট্রেনে ঢুকে ফোন খুলে দেখি ক্যামেরা ঘোরানো ছিল সেলফি মোডে, কুতুবমিনারের বদলে নিজের নাকের ক্লোজ আপ তুলেছি। 

ইন্ডিগো গুরু দ্রোণাচার্য, সিসকা এল ই ডি এম জি রোড ষ্টেশন পেরোতে পেরোতে দেখলাম জঙ্গলের ওপারে পলিউশনের ধোঁয়ার মধ্যে মাথা তুলেছে বিরাট বিরাট অট্টালিকা। শালিমার হুডা সিটি সেন্টার ষ্টেশন থেকে দু’কিলোমিটার দূরে সুপারমার্ট টু। তার পেছনে ব্যাম্বু বোট রেস্টোর‍্যান্ট। দিল্লিতে থেকেই খোলা বুককেস ধুলোমুক্ত রাখতে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়, গুরগাঁওয়ের লোকেরা কী করেন আমি জানি না। চারদিকে বাড়ি বানানো চলছে, রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথে নামলে দু’ইঞ্চি ধুলোয় জুতো ডুবে যায়। 

ব্যাম্বু বোট। মূলত ডেলিভারির জন্য বানানো হয়েছিল, খদ্দেরদের দাবিতে বসার জায়গার ব্যবস্থা পরে করা হয়েছে। ব্যাম্বু বোট-এ কোরিয়ান, জাপানিজ, ভিয়েতনামিজ আর টিবেটান গোটাদুই আইটেমও পাওয়া যায়। আমরা গিয়েছিলাম মূলত বান মি-র আকর্ষণে। বান মি হচ্ছে ভিয়েতনামিজ একরকমের স্যান্ডউইচ। স্যান্ডউইচ আমার অন্যতম প্রিয় ফুড গ্রুপ আর আমার প্রিয়তম স্যান্ডউইচ হচ্ছে বান মি। ভিয়েতনামিজ ব্যাগেটের ভেতর পোরা মাংস কিংবা মাংসের পেস্ট কিংবা অন্য কিছু। তবে আমার মতে মাংসটা আসল নয়, আসল হচ্ছে ভিয়েতনামিজ ব্যাগেট যেটা ফ্রেঞ্চ ব্যাগেটের থেকে বেঁটে আর নৌকোর মতো দেখতে আর তার থেকেও আসল হচ্ছে ভিনিগারে ভেজানো শশা, ধনেপাতা, গাজর, ডাইকন আর পাতলা পাতলা লাল কচি মুলো মিলিয়ে যে একটা তাজা সুগন্ধী কম্বিনেশন। 

স্যাডলি, ব্যাম্বু বোট-এর বান মি-তে এ দুটোর কোনওটাই নেই। ব্রেডের ব্যাপারটা ভদ্রমহিলা শুরুতেই বলে দিলেন। ভিয়েতনামিজ ব্যাগেট ওঁর খরিদ্দাররা পছন্দ করেনি। শক্ত বলে অভিযোগ করেছে। এই অভিযোগটা আমি কল্পনা করতে পারি। অর্চিষ্মানও কড়মড়ে পাউরুটি পছন্দ করে না, ওর ভালো লাগে অ্যামেরিকান স্টাইল হোয়াইট ব্রেড যেগুলো চিবোতে গেলে টাকরায় সেঁটে যায়। কাজেই ব্যাম্বু বোট এখন ভারতীয় পাউরুটি দিয়ে বান মি বানায়। 

পুলড পর্ক বান মি। ভেতরে শশা ধনেপাতা মুলোও নেই। বেসিক্যালি পুলড পর্ক স্যান্ডউইচ। ভালো খেতে। অর্চিষ্মান খুব তারিয়ে তারিয়ে খেয়েছে। আমি বান মি-র জন্য হন্যে হয়ে না থাকলে আমারও ভালো লাগত।

এই হার্টব্রেকটা বাদ দিলে ব্যাম্বু বোটের আর সব ভালো। বসার জায়গা ভালো। ডানদিকে উঁচু পাঁচিলের আড়াল থেকে এসে পড়া সূর্যের রশ্মি ভালো, গাছের সবুজ সজ্জা ভালো, ভদ্রমহিলার ব্যবহার অত্যন্ত ভালো। সবথেকে বড় কথা বাকি যে দুটো খাবার আমরা অর্ডার করেছিলাম, টুনা কিমবাপ আর চিকেন রমেন, সে দুটোও মারাত্মক ভালো।

আমার বেস্ট লেগেছে টুনা কিমবাপ। কিমবাপকে কোরিয়ান সুশি বলে চালানো যায়। শুকনো সিউইডে জড়ানো আঠাভাত আর টুনামাছের পেস্ট। বান মি-তে যে জিনিসটা থাকার কথা ছিল, ওই শশা ধনেপাতার কম্বোটা, এই কিমবাপে আছে। টুনার পরিমাণেও কিপটেমো নেই। তিল ভাসানো সয়া সসে চুবিয়ে মুখে পুরলেই স্বর্গ। 

চিকেন রমেন, খুব সরল করে বললে, ম্যাগির সুপ। খারাপ লাগার কথাও ছিল না, লাগেওনি। আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে আসতে বাড়িতে আমরা আজকাল ঝোলঝোল ম্যাগি খাচ্ছি মাঝে মাঝে, ব্যাম্বু বোটের রমেনে এক্সট্রা হল গিয়ে মিসো পেস্টের নোনতা স্বাদ, মোটা মোটা মুরগির মোটা কিন্তু নরম টুকরো, আর মাশরুম। মচৎকার।

দূরত্ব আর অ্যাকটিভিটির মাপকাঠিতে আমাদের কালকের বেড়ানোকে আউটিং বলাটা বাড়াবাড়ি হবে হয়তো, কিন্তু আনন্দ দিয়ে মাপলে দশটা আউটিং-এর সমান হয়েছে।



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.