April 28, 2017

সুবিধে অসুবিধে



সাধারণত সকাল ছ’টা নাগাদ জানালার পর্দার ছায়া আমার চেয়ারের পেছনে লম্বা হয়ে পড়ে। কাল পড়ল না। সাধারণত ছ’টা নাগাদ আমাদের দক্ষিণের জানালাওয়ালা বাথরুম আলোয় ভেসে যায়, কাল গেল না। আমি বারান্দায় বেরোলাম তদন্ত করতে।

দেখি রোদ তো নেইই, তার বদলে শনশনে হাওয়া। সারা পাড়া জুড়ে গত ক’দিন ধরেই একটাদুটো সাদা সাদা রোঁয়ার বল উড়ে বেড়াচ্ছিল, আজ তারা দলে দলে চলেছে গলি দিয়ে বাঁদিক থেকে ডানদিক, ডানদিক থেকে বাঁদিক। গলির মুখটায় একজন সিকিউরিটি দাদা সারা রাত বসে থাকেন, ছ’টায় তাঁর ছুটি। অন্যদিন পাঁচটা পঞ্চান্নতে তিনি টিফিনবাক্স ব্যাগে পুরে, সাইকেলে চড়ে, এক পা প্যাডেলে রেখে রেডি থাকেন, আজ চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে, পা জোড়া সামনের একটা ভাঙাচোরা মোড়ায় তুলে মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছেন। 

এদিকে অর্চিষ্মানের ঘুম ভেঙে গেছে। চা নিয়ে বসে আমরা সাদা বলের মিছিল দেখলাম। হাওয়ার বেগ ক্রমে ঊর্ধ্বগামী, বাড়িওয়ালার সজনে গাছের নরম কাণ্ড, জমির এক হাত ওপর থেকে দুলতে শুরু করেছে। কচি সজনেগুলো সরু ডাল ধরে ঝুলে আছে, প্রাণভয়ে না মহানন্দে, এক্সপ্রেশন দেখে বোঝার উপায় নেই। মাঝে মাঝে গাছটার অস্তিত্ব ভুলে গেলে পর্দার  ওপাশে দুলন্ত ডালপালা দেখে ভয় লাগে। যেন একটা লম্বা লোক মাথা নেড়ে নেড়ে ডাকছে। 

আমরা জানালা খুলে পর্দা সরিয়ে দিলাম। তুলোর বল, সজনে ফুলের টুকরো ঘরে ঢুকে এল। প্রথমে দুশ্চিন্তা হল, তারপর ময়লা থেকে মন তুলে মেঘে স্থাপন করলাম। দুটো তিনতলা বাড়ির ফাঁকের আকাশ ততক্ষণে ঘোলাটের বদলে কালো হয়ে এসেছে। ঘরের ভেতরের টেম্পারেচার তখন নেমে এসেছে, এসির মাপে হয়তো বাইশও নয়, কিন্তু এ ঠাণ্ডা মাপার সাধ্য এসির নেই, এ শীতলতা অন্য রকমের। 

অর্চিষ্মান বলল, “কী ভালো লাগছে না? অথচ একসময় বৃষ্টি কী খারাপই না লাগত। দাঁত থাকতে লোকে দাঁতের মর্ম ইত্যাদি।”

ওর নাকি বৃষ্টি মোটে ভালো লাগত না ছোটবেলায়, যখন ক্যালেন্ডারে আষাঢ় শ্রাবণ দু’দুখানা গোটা মাস ধার্য ছিল বর্ষার খাতে আর ওই দু’মাস ধরে ক্রমাগত আকাশ থেকে জল পড়ত, বাড়ি থেকে বেরোনো মাত্র জমা জলের ডোবায় পা পড়ে কাদা ছিটকে উঠত সাদা শার্টে, অটোর লাইনে লোকের ছাতার জল মাথায় টুপটাপ ঝরত আর স্কুলের দশ হাজার জোড়া ভেজা জুতোর বোঁটকা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসত। এ জিনিস ভালোবাসে কী করে কেউ?

আমি চুপ করে রইলাম। এ নীরবতায় সম্মতির লক্ষণমাত্র নেই। 

অর্চিষ্মান বুঝল সেটা। ক্রিম ক্র্যাকারের ঠিক মাঝখানে ল্যান্ড করা একটা পুঁচকে তুলোর বলকে চিমটি দিয়ে তুলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বলল, “তোমাদের জলটল জমত না বুঝি? জুতোটুতো ভিজত না?…”

খুব অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হলে মানুষের মধ্যে একটা বুদ্ধুভুতুম ব্যাপার হয়, বাকরুদ্ধ হয়, হাত পা নাড়াচাড়ার ক্ষমতা অন্তর্হিত হয়, আমারও সেই রকম হল। আমি হাঁ করে অর্চিষ্মানের দিকেই তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু আসলে চোখের সামনে দেখছিলাম একটা অন্ধকার রাত। রান্নাঘরের দরজায় হ্যারিকেন হাতে আমি আর ঠাকুমা দাঁড়িয়ে আছি, রান্নাঘর আর বাথরুমের মাঝখানের কুয়োতলাটা একটা আক্ষরিক পুকুর হয়ে গেছে। হ্যারিকেনের ঝাপসা আলোয় দেখছি আক্ষরিক পুকুরে আক্ষরিক ঢেউ। কুয়োর গা বেয়ে সে ঢেউ চলেছে, একই সঙ্গে সামনে, ডাইনে, বাঁয়ে, সে এক অদ্ভুত বাঁকাচোরা চলন। ঠাকুমাও দেখতে পেয়েছেন। হ্যারিকেন তুলে চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখে নিশ্চিন্ত গলায় বলছেন, “ঢোঁড়া। চল চল।” আমি পুকুরে অতি সাবধানে পায়ের পাতা নামাচ্ছি। “ঢোঁড়া সাপ কামড়ালে লাগে না?” ঠাকুমা ভাবছেন কয়েক সেকেন্ড। “লাগবে হয়তো, কিন্তু মরবা না।” ঠাকুমার মুখ ছায়ায় ঢাকা, গলার স্বরে অটল আশ্বাস।  

রাতটা বদলে গেল। এ রাতেও ব্যাকগ্রাউন্ডে একটানা ঝমঝম। এ রাতেও হ্যারিকেন। রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের হাজার দোষ থাকতে পারে, নিয়মানুবর্তিতা দেখার মতো। অ্যাট লিস্ট, আমাদের ছোটবেলায় দেখার মতো ছিল। আজকাল কী হয়েছে বলতে পারব না। রান্নাঘরের মেঝেতে আসন পেতে বাবু হয়ে বসে খাচ্ছি। হ্যারিকেনের আলোয় সাবধানে কাঁটা বাছতে হচ্ছে। বাঁ হাত কোলের ওপর রেখে ডানহাত দিয়ে গ্রাস তুলে মুখে পুরছি, নরম শিরদাঁড়া বাধ্য মেয়ের মতো ঝুঁকে আছে, যতক্ষণ বলব ততক্ষণই থাকবে, ট্যাঁফো করবে না। হঠাৎ বুক ধড়াস। চশমার ডান ফ্রেমের কোণে কী যেন একটা লাফিয়ে ঢুকেছে। 

একটা প্রাপ্তবয়স্ক কোলাব্যাঙ। আমার চমকানি তাকেও চমকে দিয়েছে। থেমে, ঘাড় বেঁকিয়ে গোল গোল চোখ দিয়ে দেখছে আমাকে। ভারি বিরক্ত মুখ। "তুমি হার্ট অ্যাটাকে মরতে চাও মর না, আমাকে সহমরণে নেওয়ার কী দরকার?” বকা শেষ করে আরেকটা লাফ দিয়ে বাকি রান্নাঘরটুকু পেরিয়ে নালির মুখে পৌঁছে গেল ব্যাঙ।

আপনারা বলবেন, ব্যাঙ কথা বলতে পারে নাকি? আমার মা সাক্ষী আছেন। মেয়েকে হার্ট অ্যাটাকে মরার কোলাব্যাঙের অভিশাপ ফলার ভয়ে মা তার পরপরই ডাইনিং টেবিলের অর্ডার দিলেন, কারও মতামতের তোয়াক্কা করলেন না। 

রাতের বদলে এবার চোখের সামনে খটখটে দুপুর। খটখটে যদিও নয়, রামভেজা বলাই বরং উচিত হবে। সকাল থেকে নেমেছে, তারই মধ্যে অফিস, কলেজ, স্কুল। স্কুলের শাড়ি। ছাতা বেয়ে জল পড়ে ব্লাউজের হাতা অলরেডি সপসপে, গোড়ালির কাছে লালপাড়টুকু বাঁচানোর চেষ্টায় কুঁচি খামচে তুলে রেখেছি। তুলতে তুলতে শাড়ি হাঁটু পর্যন্ত  আর আমিও শ্রীরামপুর স্টেশনের কালভার্টের মুখে। একমুহূর্ত থমকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কুঁচি থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। কালভার্টে পা রাখামাত্র গভীর কালো জল এক বছর দেখা না হওয়া বন্ধুর মতো দৌড়ে এসে কোমর জড়িয়ে ধরল। 

অর্চিষ্মানের প্রশ্নের শেষটুকু কানে এল। “…অসুবিধে হত না বুঝি?”

আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি । দরজার সামনে জলভরা বালতি আর মগ রেখে গেছে কেউ বুদ্ধি করে। পা ধুয়ে ঘরে ঢুকছি, হাঁচছি ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ, এদিকওদিক থেকে দয়ালু হাতেরা এগিয়ে দিচ্ছে গামছা, শুকনো জামা, কমপ্ল্যানের গ্লাস। উপদেশ উড়ে আসছে চানে যাওয়ার। কলের জল দিয়ে বৃষ্টির জল ধুয়ে ফেললে নাকি ঠাণ্ডা লাগে না। এরকম উদ্ভট যুক্তির প্রতিবাদ করতে পারি কিন্তু করছি না। কারণ ততদিনে জেনে গেছি তর্কে জেতাহারার সঙ্গে যুক্তির ঠিকভুলের কোনও সম্পর্ক নেই। তর্কটা একটা আর্ট, আর আমার বাড়ির লোকেরা একেকজন পোড় খাওয়া আর্টিস্ট। তাছাড়া ব্যর্থ তর্ক করে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। লাইব্রেরির বই অপেক্ষা করছে। কমপ্ল্যানের গ্লাস নিয়ে, চাদর মুড়ি দিয়ে তাকে নিয়ে আমি এখন বসব জানালার পাশ ঘেঁষে, জানালার শিক বেয়ে জলের ফোঁটার মিছিল চলবে, দমকা হাওয়ার ঝাপটায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে মাঝে মাঝে, মেঘের ফাঁক দিয়ে আসা অপ্রতুল আলোয় যতক্ষণ পারা যায় খুদি খুদি অক্ষরের দিকে তাকিয়ে থাকব যতক্ষণ না কেউ এসে “চোখদুটোকে একেবারে খুন না করে ফেলে কি শান্তি নেই?” বলে আলো জ্বেলে দিয়ে যাবে। 

অর্চিষ্মানকে বললাম, “কই, অসুবিধে হয়নি তো কখনও। বরং যা হয়েছে সেটা যদি অসুবিধেই হয়, তাহলে গোটা জীবনটাই অসুবিধেজনক হলে আমি বর্তে যাই।”


April 25, 2017

পুরোনো ফ্রেম



কাল বেলা এগারোটা নাগাদ আন্টিজির দোকানের দিকে হাঁটছিলাম। রোজই যে রকম হাঁটি। কানে ফোন লাগানো ছিল। রোজই যে রকম থাকে। ফোনের ওপারে হয় দুই মায়ের একজন, নয় তিন্নি, নয় অর্চিষ্মান ছিল। রোজই যেমন থাকে। এমনিতে ওই সময় ফোনের ওপাশে এই চারজনের মধ্যে কে ছিল আমার পক্ষে মনে করা বলা অসম্ভব, কিন্তু কাল কে ছিল বলতে পারব। 

অর্চিষ্মান।

কারণ কালকের কথোপকথনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। অথচ মনে থাকার কথা নয়। কারণ রোজই আমাদের কথোপকথন একটা গত ধরে চলে।  

“কী চলছে? লাইফে ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটল? 
-কিছু না। তোমার?
-আমারও না। জঘন্য। 
-সিরিয়াসলি। ওকে টাটা।
-ওকে টাটা।”

কালকেও কথাবার্তা এই গতেই চলছিল। কিন্তু  "সিরিয়াসলি" আর "ওকে টাটা" বলার মাঝখানের মুহূর্তে আমি একটা দৃশ্য দেখলাম যা আমাদের কথোপকথনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। 

আমি দেখলাম সামনে চারপাঁচটা ছোট ছোট জটলা। অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের। 

আপনি বলবেন, এতে মোড় ঘোরানোর কী আছে? অল্পবয়সীদের স্বভাবই জটলা করা। 

ঠিক। আমার বাবামায়েরা করতেন, ঠাকুমাদাদুরা করতেন (যদিও আমার ধারণা তাঁদের আমলের জটলাগুলো ওনলি মেল কিংবা ওনলি ফিমেল হত), আমরা করতাম, আজকালকার ছেলেপুলেরাও করছে, এদের ছেলেমেয়ে, নাতিপুতিরাও করবে। 

কারণ ওই বয়সটাই জটলা করার। যৌবন বন্ধু আকর্ষণ করে, বয়স বেড়ে গেলে লোকে বোকা হয়ে যায়, সেই সঙ্গে একাও। তখন আর কেউ তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় না। তখন খালি একা একা চা খেতে যেতে হয়, আর বাড়ির লোককে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে চাতকের মতো জানতে চাইতে হয়, ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটল কি না। 

জটলা চিরন্তন, কিন্তু দেশকাল ভেদে জটলার চরিত্র, অনুষঙ্গ আলাদা। আমাদের বাবাদের জটলায় রক একটা বড় অনুষঙ্গ ছিল।  আমাদের মফস্বলের জটলায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাইকেল। কোনও কোনও জটলার হাতে থাকত সিগারেট, কারও হাতে খুরির চা কিংবা ফুচকার শালপাতা, কারও হাতে গাঁজার জয়েন্ট। কোনও কোনও জটলার প্রপস এত সুস্বাদু কিন্তু রোমাঞ্চকর হত না, যেমন ফুলবাগানের গলির জেরক্সের দোকানের সামনে আমাদের জটলা। আমাদের জটলার কপালে জুটত কেবল নোটের তাড়া। 

ইদানীং যে সব জটলাগুলো দেখি সেগুলোর এত করুণ দশা নয়। সব জটলার আশেপাশে প্যাজেরো, হোন্ডা সিটি হয়তো পার্ক করা থাকে না, কিন্তু খুব দুঃখী জটলাতেও স্মার্টফোন থাকে। ইন ফ্যাক্ট, কিছু কিছু জটলা এই ফোন ঘিরেই গড়ে ওঠে। আমি দূর থেকে বুঝিনি যে এই জটলাগুলোও সেই গোত্রের। তারপর দেখলাম প্রতি জটলা থেকে একজনের হাত আকাশের দিকে উঠে আছে, আর সেই হাতে স্মার্ট ফোন, তখন আমার কাছে জটলার চরিত্র স্পষ্ট হয়ে গেল। 

এ হচ্ছে সেলফি জটলা। 

আরেকটু এগোতে আর সন্দেহের অবকাশ রইল না। 

এ সব জটলার চেহারা, অনেক শহরে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মিছিলের যে চেনা ভাস্কর্য থাকে, সেরকম। মিছিলের অগ্রে নেতার হাতে শুধু পতাকার বদলে ফোন, তার একটু পেছনে বা পাশে সবাই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে। কারও কারও (মহিলাদের) হাঁটু ভাঙা, এক পায়ের পাতা মাটিতে, অন্য পায়ের আঙুলের ডগা জাস্ট মেঝে ছুঁয়ে আছে, ঠোঁট ছুঁচোলো, চোখে কৃত্রিম বিস্ময়। পুরুষরা যদিও দু’পা মাটিতে রেখেছেন, অনেকেই আঙুল শ্যাম্পু করা চুলের মধ্যে চালিয়ে কপাল চওড়া করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। কবজি থেকে মানতের সুতোর শেষপ্রান্ত দোল খাচ্ছে। 

পর পর এ রকম তিনটে জটলা পেরিয়ে আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না। এই যৌবন যে আমার আর ফিরে আসবে না, সেই হিংসেতেই হবে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে অকুস্থল পেরিয়ে ঘটনার বিবরণ দিয়ে আমি অর্চিষ্মানকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, এই ছবিগুলো পরে দেখলে নিজেদের হাসি পাবে না?”

অর্চিষ্মান একটু ভেবে বলল, “অল্প পুরোনো হলে হয়তো হাসি পেলেও পেতে পারে, কিন্তু বেশি পুরোনো হয়ে গেলে আবার ভালো লাগবে।”

কথাটা সত্যি। বাড়িতে গেলে পুরোনো ছবি দেখি, খাটো আঁচল ছোট ছাতা সানগ্লাস মাসিপিসি, বেলবটম বাবা - হাসি পায় না একটুও, বরং বুকের ভেতর কেমন একটা হয়, সাহেবরা যাকে ওয়ার্ম ফাজি ফিলিং বলে ঠিক সে রকম। নাকতলার বাড়িতে সকালে মা যখন চা আর জলখাবার করছিলেন আর বাবা ঘুরে ঘুরে বাড়ির দরজা জানালা খুলছিলেন, নিচে যাচ্ছিলেন বাজার করতে, আমি আর অর্চিষ্মান খাটের ওপর পুরোনো অ্যালবাম পেড়ে ছবি দেখছিলাম। সামান্য হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি। মাবাবার ছবি, মামামিমির ছবি, তিন্নি, অর্চিষ্মানের ছবি। অর্চিষ্মানের একদম ছোটবেলার ছবি খুব মজার, কিন্তু আমার বিশেষ উৎসাহ লাগে না। শিশুদের সব ছবিই একরকম, কে অর্চিষ্মান, কে কুন্তলা, কে তিন্নি বোঝার উপায় নেই। সকলেই ভয়ানক মোটা, সকলেরই মুখে বুড়ো আঙুল, সকলেই গামলার জলে ঘটের মতো বসে আছে। এক্সপ্রেশনও অতি লিমিটেড, কান্না কিংবা আতংক। 

আমার ইন্টারেস্টিং লাগে তিন্নির একটু বড় বয়সের ছবি দেখতে। কারণ আমার বাড়ির অ্যালবামে অবিকল ওইরকম ছবি আছে অনেক। আমার ছবি। তিন্নি আমার থেকে প্রায় এক হাত লম্বা, তা ছাড়া বাকি সব এক। হেয়ারব্যান্ড, জামার ছিট, ফ্রকের কাট, চশমার ফ্রেম। গোল, প্রকাণ্ড, এবং গোলাপি রঙের।

রিষড়ার বাড়ির অ্যালবামের ছবি দেখে প্রথম ওই জিনিসটাই চিনেছিল অর্চিষ্মান। “তোমারও এই ফ্রেম! এই বীভৎস ফ্রেমটা দিদিকেও পরাত বাবা মা।”

আমি সেই থেকে ভাবছি, আর ক’বছর কাটলে, অ্যালবামের ছবিগুলো আরেকটু হলদে হয়ে গেলে কি আমারও ওগুলো ভালো লাগবে? মনে হবে, দেখেছ, আমাদের সময়ের চশমার ফ্রেমগুলোও এখনকার থেকে ভালো ছিল? 


April 23, 2017

এ মাসের বই/ এপ্রিল ২০১৭/ ১



We/Yevgeny Zamyatin




উৎস গুগল ইমেজেস


জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ যাঁরা পড়েছেন আর Yevgeny Zamyatin-এর ‘উই’ যাঁরা পড়েননি, খুব সহজেই তাঁদের সঙ্গে দ্বিতীয় বইটির পরিচয় করানো যায়। দুটি বইয়ের চরিত্র, ঘটনাবলী, ক্লাইম্যাক্স অবিকল এক। 

Yevgeny Zamyatin-এর ‘উই’ লেখা হয়েছিল অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর লেখা হওয়ার পঁচিশ বছর আগে। হয়তো দৈববলে দুই লেখকের মগজে একই প্লট, একই চরিত্রেরা হাজির হয়েছিল? হয়তো জর্জ অরওয়েল ‘উই’-এর কথা জানতেনই না? এই সম্ভাবনা শূন্য, কারণ উনিশশো ছেচল্লিশে, নাইনটিন এইটি ফোর প্রকাশের তিন বছর আগে অরওয়েল ‘উই’ উপন্যাসের একটি সমালোচনা লেখেন “ট্রিবিউন” পত্রিকায়। 

‘উই’ উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ভবিষ্যতের কোনও একটি সময়ে। এক হাজার বছর আগে এক দীর্ঘ সংগ্রামের পৃথিবী অ্যামেরিকার অধীনতা স্বীকার করেছে, এখন গোটা পৃথিবীটাই ওয়ান স্টেট এবং সেই স্টেটটি হল অ্যামেরিকা। উইনস্টন স্মিথ-এর বদলে 'উই'-এ আমাদের বক্তা ডি- ৫০৩। মিনিস্ট্রি অফ ট্রুথ-এ ইতিহাস সংশোধনের বদলে ডি ৫০৩-এর কাজ হল স্পেসশিপ বানানো। ‘ইনটিগ্র্যাল’ নামের মহাকাশযান বানানোর প্রোজেক্টের তিনি চিফ ইঞ্জিনিয়ার। ওয়ান স্টেটে “আই” বলে কিছু নেই, সব “উই”। ওয়ান স্টেটে খিদে নেই, অভাব নেই, স্বাধীনতা নেই, সেক্স নেই। সেক্স আছে, নিয়মমাফিক সেক্স। স্টেট থেকে পিংক স্লিপে নাগরিকদের সেক্সসঙ্গী অ্যাসাইন করা হয়। ডি ৫০৩-এর একজন মোটামুটি রেগুলার সেক্সসঙ্গী আছে, ও-৯০। স্টেট নির্ধারিত নির্দিষ্ট দিনে ও-৯০, ডি ৫০৩-র ঘরে আসে। কতক্ষণ থাকবে সে সব ঠিক করা আছে, খাওয়া এবং ঘুমের সময়ের মতোই। ওই সময়টুকুর জন্য ঘরের পর্দা নামিয়ে রাখার অনুমতি আছে, বাকি সর্বক্ষণ স্বচ্ছ কাচের চার দেওয়াল খোলা রাখতে হয়, যাতে অভিভাবক (অরওয়েল-এর বিগ ব্রাদার এখানে “ওয়েল-ডুয়ার”) তাঁর প্রজাবর্গের ওপর নজর রাখতে পারেন। 

এ ব্যবস্থায় আমাদের ডি ৫০৩ খুশি। 

"this morning I was on the dock where the Integral is being built, and I saw the lathes; blindly, .with abandon, the balls of the regulators were rotating; the cranks were swinging from side to side with a glimmer; the working beam proudly swung its shoulder; and the mechanical chisels were dancing to the melody of unheard tarantellas. I suddenly perceived all the music, all the beauty, of this colossal, this mechanical ballet, illumined by light blue rays of sunshine. Then the thought came: why beautiful? Why is the dance beautiful? Answer: because it is an unfree movement. Because the deep meaning of the dance is contained in its absolute, ecstatic submission, in the ideal non-freedom." 

একদিন ও-৯০-র সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়ে ডি ৫০৩-র দেখা হয়ে যায় আই-৩০৩ নামের এক নারীর সঙ্গে। কামতৃষ্ণায় পাগল হয়ে ঘড়িবাঁধা জীবনের কক্ষপথ থেকে ছিটকে যায় ডি-৫০৩। তারপর আই-৩০৩-র হাত ধরে ডি-৫০৩-র আলাপ হয় একদল অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে, যারা হ্যাপিনেস চায় না, স্বাধীনতা চায়। 

তারপর কী হয় জানতে গেলে আপনাকে 'উই' পড়তে হবে। সামান্য এদিকওদিক বাদ দিলে 'উই'-তেও তাই হবে যা 'নাইনটিন এইটি ফোর'-এ হয়েছিল। বা বলা উচিত, 'নাইনটিন এইটি ফোর'-এও তাই হয়েছিল যা 'উই'-তে হইয়েছিলেন Yevgeny Zamyatin। 

Yevgeny Zamyatin ছিলেন সাবেকি বলশেভিক। বলশেভিক আন্দোলনের শরিক হয়ে তিনি জেল খেটেছিলেন, অজ্ঞাতবাসে থেকেছিলেন। বিপ্লবের পর তাঁর সহযোগী বিপ্লবীরাই তাঁকে আবার জেলে পাঠিয়েছিল, বিপ্লবের পরিণতি নিয়ে ঠাট্টা করে বই লেখার জন্য। 

কিছু লোক থাকে যাদের যে কাজটা যত মানা করা হয় সে কাজটা তত বেশি করে করে, Zamyatin ছিলেন সেই গোত্রের লোক। উনিশশো সতেরোর বিপ্লবের পর ক্রমাগত তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখছিলেন। উনিশশো তেইশ সালে 'উই' শেষ করার পর তিনি বুঝলেন এ জিনিস সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশ করা অসম্ভব। তিনি পাণ্ডুলিপি পাচার করলেন অ্যামেরিকায়, যেখানে ইংরিজি ভাষায় অনুবাদ হয়ে উই বেরোলো উনিশশো চব্বিশে। পত্রপাঠ তাঁর সমস্ত লেখা তাঁর নিজের দেশে ব্যান হল, এবং তিনি কারারুদ্ধ হলেন। উনিশশো একত্রিশে বন্ধু ম্যাক্সিম গোর্কির সহায়তায়, স্তালিনের কাছে আবেদন করে তিনি দেশ ছাড়লেন এবং প্যারিসে, দারিদ্র্যের মধ্যে মারা গেলেন উনিশশো সাঁইত্রিশে। Zamyatin বিশ্বাস করতেন সাহিত্য যদি করতেই হয়, তবে সে রকমই করা উচিত যা সিস্টেমকে শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না। "[H]armful literature is more useful than useful literature," বলে গিয়েছেন তিনি। 

অরওয়েল নিজে কোনওদিন তাঁর বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের প্রেরণা হিসেবে ‘উই’-এর নাম করেননি। হাক্সলি-র ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর বিরুদ্ধেও 'উই'-এর প্লট চুরির অভিযোগ উঠেছিল। হাক্সলি খোলাখুলি তা অস্বীকার করেন। এসবের ভিড়ে একমাত্র উজ্জ্বল উদ্ধার কার্ট ভোনেগাট। তাঁর ‘প্লেয়ার পিয়ানো’ উপন্যাসের প্রেরণার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,I cheerfully ripped off the plot of Brave New World, whose plot had been cheerfully ripped off from Eugene Zamiatin’s We.” 



*****

Station Eleven/ Emily St. John Mandel



উৎস গুগল ইমেজেস


শুরুতে সবাই ভেবেছিল অন্যান্য এপিডেমিকের ক্ষেত্রে যেমন হয় এটাও তেমন হবে। কিছু লোক মরবে। যত লোক মরার ভয় পাবে তার থেকে অনেক কম। তারপর সব আবার আগের মতো। পৃথিবীর মেডিক্যাল ইতিহাসে জাস্ট একটা চ্যাপ্টার।  

বই যখন লেখা হয়েছে তখন ঘটনাটা যে সে রকম হয়নি বুঝতেই পারছেন। মস্কো থেকে একদল জ্বোরো যাত্রী নিয়ে প্লেন এসে নামল উত্তর অ্যামেরিকায়, হয়তো তারাই “জিরো পেশেন্ট”। হয়তো নয়। কে জানে। আমরা শুধু জানলাম শীতের বরফপড়া শান্ত সেই রাতে থিয়েটারে বসে শেক্সপিয়ারের নাটক দেখছিল জীবন চৌধুরী, তার চোখের সামনে অভিনয় করতে করতে বুক চেপে ধরে মরে গেল এক নক্ষত্র অভিনেতা, যাকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে প্যারামেডিক ট্রেনিং নেওয়া জীবন, নিজের জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে গেল। আর তার ঘণ্টা কয়েক পরই হাসপাতাল থেকে বন্ধুর ফোন এল। এক অদ্ভুত জ্বরে ছেয়ে যাচ্ছে সারা শহর, জীবন যেন পালিয়ে যায় শহর ছেড়ে দূরে। কোথায় পালাবে জীবন? সাত ট্রলি দরকারি জিনিস নিয়ে পঙ্গু ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে খিল দিল জীবন। আর তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গোটা পৃথিবীর “৯৯.৯%” জনসংখ্যা লুপ্ত হয়ে গেল “জর্জিয়া ফ্লু”তে।

এর পরের ঘটনা শুরু হয় সেই গ্রেট ক্লিনসিং-এর কুড়ি বছর পর, যখন পৃথিবীতে পরিত্যক্ত থার্মাল পাওয়ার ষ্টেশন আছে কিন্তু ইলেকট্রিসিটি নেই, কম্পিউটারের ডাঁই হওয়া মৃতদেহ আছে কিন্তু ইন্টারনেট নেই, ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতাল নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই।

বলা বাহুল্য, ধর্ম আছে। ধর্মগুরুও আছেন। বালিকাবিবাহের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি বালিকা ধরে ধরে নিজের হারেম সাজাচ্ছেন। 

আর আছে একটি ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার গ্রুপ। তারা ঘুরে ঘুরে শেক্সপিয়ারের নাটক অভিনয় করে বেড়ায়। ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারি গল্পের মূল চরিত্রগুলোর সুতো সব বাঁধা আছে কুড়ি বছর আগের হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার সেই অভিনেতা আর্থারের সঙ্গে। তাঁর প্রথম স্ত্রী মিরান্ডা, দ্বিতীয় স্ত্রী এলিজাবেথ, পুত্র টাইলার, বন্ধু ক্লার্ক সবাই। জীবন চৌধুরীকেও আমরা দেখতে পাই পরে আরেকবার। তবে এঁরা সকলেই সেকেন্ডারি চরিত্র। 'স্টেশন ইলেভেন'-এর প্রধান চরিত্র কার্স্টেন রেমন্ড, ইয়ার জিরোতে যাঁর বয়স ছিল আট, আর মারা যাওয়ার আগে আর্থার যাকে দুটো কমিক বই উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের নাম ‘স্টেশন ইলেভেন’। 

এমিলি সেন্ট জন ম্যান্ডেলের চতুর্থ উপন্যাস 'স্টেশন ইলেভেন'। ঘরানায় বাঁধতে গেলে একে ফেলতে হবে কল্পবিজ্ঞানের গোত্রে, আরও খুঁটিয়ে দেখলে 'পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক' গোত্রে। আমি সাধারণত কল্পবিজ্ঞানে উৎসাহ কম পাই, পোস্ট অ্যাপোক্যালিপসে আরও কম। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে কিংবা প্রেমে দাগা খেয়ে একজন মানুষ অন্য মানুষের প্রাণ নিচ্ছে, এতদূর আমার কল্পনা পৌঁছতে পারে, কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে, কারেন্ট নেই, কম্পিউটার নেই, লোকে তীরধনুক দিয়ে শিকার করছে, অতদূর পারে না। পড়লেই মনে হয়, যতসব গাঁজাখুরি। কিছু পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস আমি পড়েছি, মার্গারেট অ্যাটউডের 'হ্যান্ডমেড’স টেল', কার্ট ভনেগাটের 'ক্যাট’স ক্রেডল' ইত্যাদি, কিন্তু সংখ্যায় তারা নগণ্য। কাজেই পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক উপন্যাস হিসেবে 'স্টেশন ইলেভেন'-এর ভালোমন্দ বিচার আমি করতে পারব না। এমনি গল্প হিসেবে করতে পারি, তাই করছি। 

পোস্ট অ্যাপোক্যালিপটিক ইত্যাদি হওয়া সত্ত্বেও আমার মতো অনুৎসাহী পাঠক যে সাড়ে তিনশো পাতার বই দু'দিনে শেষ করতে পেরেছে সেটাই ‘ স্টেশন ইলেভেন’-এর সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ। ম্যান্ডেল খুবই শক্তিশালী লেখক। চরিত্রদের রক্তমাংসের করে তোলায়, ওই অদ্ভুত, অকল্পনীয় পৃথিবীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায় তিনি সফল। কেউ কেউ দেখলাম বলেছেন, জর্জিয়া ফ্লু এবং তৎপরবর্তী ধ্বংসলীলা বাস্তব নয়, ইলেকট্রিসিটি কেন ফেল করল, করলেও বা কেউ লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটই পড়ে সে ফেলিওর সারিয়ে তুলতে পারল না কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার এসব অসুবিধেজনক লাগেনি। কল্পনা বাস্তবনিষ্ঠ হল না কেন তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। 

আমার খারাপ লেগেছে বইটির “কোটেবিলিটি”। এমনিই গোটা ব্যাপারটা ভয়ানক চক্ষুরুন্মীলক। এই আছি এই নেই। এই কামড়াকামড়ি করছি, রাগে ফাটছি, ঈর্ষায় জ্বলছি। এই জ্বর হয়ে মরে গেলাম। মরলে তবু একরকম, না মরলে আরও বিপদ। যত আরাম টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নিয়েছিলাম সব হাওয়া, তখন নদীর ঘোলা জল, গাছের বিষ ফল খেয়ে, আমার থেকে শক্তিশালী মানুষদের (যারা আমার মতোই সারভাইভালের জন্য লড়ছে) হাতে মার খেয়ে, ধর্ষিত হয়ে মর, নয়তো তাদের মারতে শেখো। কাউকে না-ঘাঁটানো না-চটানো কেরানি থেকে বন্য খুনি। 

এতেও যদি জীবনের সারসত্য বোঝা না হয় তাহলে আর কীসে হবে আমি জানি না। তাঁর পাঠকরাও যে বুঝবে সে বিশ্বাসটা লেখক রাখতে পারেননি, এবং “Hell is the absence of the people you long for.” “They spend all their lives waiting for their lives to begin.” “Survival is insufficient.”(এই উদ্ধৃতিটা অবশ্য 'স্টার ট্রেকঃ ভয়েজার' থেকে ধার করা বোধহয়, আমি স্টার ট্রেক দেখিনি, কারণ হিসেবে কল্পবিজ্ঞানের প্রতি আমার উদাসীনতা দ্রষ্টব্য, সবাই বলছে তাই জেনেছি) গোছের কোটেশনে বই ছয়লাপ করে রেখেছেন। এক সমালোচক এ কারণে স্টেশন ইলেভেন-কে “সিউডো-ডীপ” বলেছেন, সেটা একটু বেশি রূঢ় হয়েছে বলে আমি মনে করি, তবে ডেপথ যে জায়গায় জায়গায় সামান্য কম হলেও চলত সে বিষয়ে আমি একমত। 

ম্যান্ডেলের আগের তিনটি বইয়ের তুলনায় 'স্টেশন ইলেভেন' নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক বেশি, বিক্রি হয়েছে প্রচুর। দুর্দান্ত কিছু একটা হতে চলেছে এ খবর বই প্রকাশের আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি বলছি না, 'স্টেশন ইলেভেন' খারাপ বই। আমি শুধু বলছি হাইপের ঘাড়ে চড়ে 'স্টেশন ইলেভেন' অনেক দূর গেছে যতখানি হয়তো এর যাওয়ার কথা ছিল না।


April 22, 2017

And Then The Murders Began



নিজের বইকে অন্যের বই থেকে ঢের ভালো, ঢের ইন্টারেস্টিং আর ঢের বেশি বিক্রি করতে চান? এই ট্রিকটা কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন।


April 19, 2017

দাদুর ছবি



সোমবার যখন ছুটি নিতেই হবে তখন অত তাড়াহুড়ো দেখিয়ে, বাড়ির লোকের ঘুম মাটি করে সকালের প্লেন ধরার মানে ছিল না। আরাম করে বাড়ি থেকে খেয়েদেয়ে বিকেলে বেরিয়ে রাতে ফিরলেই হত।  

কিন্তু অবান্তরের পাঠকরা জানেন, বাড়িতে আমার বড় জোর বিশ্রাম হতে পারে, আরাম হয় না। তবে আরামই তো একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বাড়ি গেলে আরও অনেক ভালো ভালো জিনিস হয়। দু’পক্ষের মাবাবার সঙ্গে দেখা হয়, পোস্তবাটা, বেগুনপোড়া আর এঁচোড়ের তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া হয়, বুদ্ধি করে তাক বুঝে যেতে পারলে (যেমন আমরা গেলাম) পয়লা বৈশাখের উপহার মেলে। আর যদি এ সবের কিছুই না হয়, ঠাকুমার সঙ্গে দেখা তো আছেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, এখন যতটুকু দেখা হয় ততটুকুই কম। 

এত সব কাজের মাঝে একেকটা মুহূর্ত আসে যা নিখাদ আরামের। রবিবার দুপুরে যেমন এসেছিল। কোন একটা চ্যানেলে ‘ব্যোমকেশ পর্ব‘ দিয়েছিল, মামেয়ে দেখলাম বসে বসে। এ ব্যোমকেশ ঘোড়ায় চড়তে পারে, লাঠি খেলতে পারে, আইটেম সঙের সঙ্গে হাতে ফুলের মালা জড়িয়ে চপল চোখে তাকাতে পারে। পরের সিনেমাগুলোয় আরও কী কী পারবে ভাবতেই আমার হৃৎকম্প হচ্ছে।

তবে এসব খালি নিন্দে করার জন্য করা, মায়ের পাশে বসে যখন  টিভিতে সিনেমাটা দেখছিলাম তখন আমার শুধু ভালোই লাগছিল। পর্দা নামিয়ে ঘর ছায়া করা ছিল, মাথার ওপর ফ্যান অল্প বেগে ঘুরছিল, চোখের সামনে বাঙালি গোয়েন্দা বাংলা রহস্য সমাধান করছিল, খারাপ লাগার জায়গাই নেই। 

আরামের ষোলোকলা পূর্ণ করেছিল তেজপুর থেকে বাবার আনা বাঁশের চেয়ারটা। সাড়ে পাঁচ ফুটের নিচে হাইটওলা যে কেউ গোটা শরীরটা নিয়ে চেয়ারের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। এখন ওই চেয়ারটায় বসার জন্য বাড়িতে রীতিমত মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা হয়, অথচ আমরা এই চেয়ারের কার্যকারিতা নিয়ে কত সন্দেহই না প্রকাশ করেছিলাম। 

সন্দেহের কারণ সেই দর্শনধারিতা। বা তার অভাব। বেশিরভাগ কাজের জিনিসের মতোই চেয়ারটার চেহারা খুব একটা সুবিধের নয়। যেটা চেয়ারটার সবথেকে বড় গুণ, সেটাই ওটার সবথেকে বড় দোষ। তা হল চেয়ারটার বেঢপত্ব। তেজপুর থেকে চিরদিনের মতো ট্রান্সফার হয়ে চলে আসার সময় বাবা যখন ওই চেয়ার আর সঙ্গে মানানসই একখানা টেবিল নিয়ে হাজির হলেন, মা হতভম্ব হয়ে বলেছিলেন, "এ জিনিস কোথায় রাখব?" বাবা একটুও দমে না গিয়ে সামনের ঘরের দরজা আর তক্তপোশের মাঝখানের জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, "কেন এইখানে দিব্যি ফিট করে যাবে।" 

গেলও। দেওয়ালে ঝুলন্ত ঘোর নীলবর্ণ মাকালীর ছবির নিচে। মাঝে মাঝে মাকালীর মাথায় গোঁজা জবাফুল চেয়ারের ওপর খসে পড়ে থাকে, আমরা বসার আগে সে ফুল ওই চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়েই মায়ের মাথায় আবার ফিট করে দিই। 

চেয়ারের বিরুদ্ধে শেষ, অক্ষম প্রতিবাদ হিসেবে মা বিড়বিড় করেছিলেন, সামনের ঘরের লুকটা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। 

মায়ের সঙ্গে সাধারণত আমি সব বিষয়েই সহমত হই কিন্তু এটাতে না হেসে পারিনি। মা নিজেও হেসেছিলেন অবশ্য। কারণ আমাদের সামনের ঘরের লুক অলরেডি চমৎকার। কোনও বেঢপ চেয়ারের সাধ্য নেই তাকে মাটি করে। একটা তক্তপোষ, দুটো চেয়ার, প্লাস্টিকের তিন থাক টেবিলের ওপর একটা টিভি, অবশেষে ফ্ল্যাট স্ক্রিন হয়েছে এই বছরকয়েক আগে। দেওয়ালে জালি দেওয়া জানালা, গজালে ঝোলানো বেঁটে বুককেস, অসংখ্য তার, অসংখ্য ফোটো, কোনওটার সঙ্গে কোনওটার সাইজের মিল নেই। নীল মাকালীর পাশে গেরুয়া বিবেকানন্দের পাশে হাতে আঁকা রবীন্দ্রনাথ। সাঁতরাগাছি কারখানায় ইঞ্জিনের সামনে সাদাকালো গ্রুপছবি। আমার যুবক ঠাকুরদার পাশে বৃদ্ধ রামঠাকুর। গলায় কণ্ঠি, হাড় বার করা শরীরে সাদা কাপড় জড়ানো, বাবু হয়ে বসে আছেন। বাঁ হাঁটুর নিচ দিয়ে ডান পায়ের পাতা বেরিয়ে আছে। লম্বা গড়নের সঙ্গে মানিয়ে সে পায়ের পাতাও রীতিমত দীর্ঘ। বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে, সম্ভবত রামঠাকুরের জন্মতিথির কাছাকাছি সময়ে ওই পায়ের পাতার দৈর্ঘ্য আরও বাড়ে। ফটোর ভেতরেই। ঠাকুমার বন্ধুবান্ধবরা সকলেই দেখতে পেত। ঠাকুমাও পেতেন। আমি ঠিক শিওর হতে পারছি না বুঝে আমার দিকে এমন অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকাতেন যে আমি নার্ভাসটার্ভাস হয়ে বলতাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ, এই তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ইঞ্চিদুয়েক বেড়েছে।"

এই ছবিটা নিয়ে একটা গল্প আছে। গত সাড়ে সাত বছরে সেটা আপনাদের বলেছি নিশ্চয়, তবু আরেকবার শুনুন। আমাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। দূর মানে রিয়েলি দূর। রাস্তায় তাঁকে দেখলে আমি চিনতে পারব না, তিনিও আমাকে পারবেন না। দু’দিকের ঠাকুরদার বাবারা কেমন যেন কাজিন ছিলেন, পড়শিটড়শিও হতে পারেন। যাই হোক, তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। সেও অনেকদিন আগে। বাবাকাকার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে তখনও আমার রীতিমত ঘাড় ব্যথা করে। ভদ্রলোকও লম্বাচওড়া ছিলেন এটুকু মনে আছে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও। তাঁর স্ত্রী এদিকে মেরেকেটে পাঁচ ফুট, পঁয়তাল্লিশ কেজি। ঘোমটাঘেরা মুখে শান্ত ভালোমানুষি মাখামাখি। গাঁকগাঁক করে জেঠু সবার সঙ্গে আলাপ করছিলেন, বাবাকাকার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় জেঠুর চোখে দেওয়ালের ছবিতে পড়ল। “ওই দেখ আমার কাকা…কেমন সুন্দর চেহারা ছিল দেখেছ?” ভুরু নাচিয়ে জেঠিকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি। 

জেঠি তৎক্ষণাৎ ঘোমটা ভালো করে টেনে দেওয়ালের দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে মন দিয়ে নমো করলেন। গদগদ স্বরে বললেন, “আহা, কী সাধকের মতো চেহারা।” 

ঘরশুদ্ধু সবাই ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে রইল, জেঠুই প্রথম ধাতস্থ হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “উফ, ওটা কাকা কেন হতে যাবে, ওটা রামঠাকুর, কাকা পাশেরটা…”

পরে সবাই খুব হেসেছিল, এখনও হাসে। জেঠির প্রতি কোনওরকম অশ্রদ্ধা থেকে নয়, একেবারেই নির্মল হাসি। হাসির আরও বেশি কারণ হল আমার দাদুর ছবিটা। জোয়ান বয়স, পরিষ্কার কামানো দাড়ি, নিখুঁত ছাঁটা গোঁফ, কুচকুচে কালো একমাথা চুলের সামনেটা সিঙাড়ার মতো উঁচু। ফটোগ্রাফারের নির্দেশেই নিশ্চয়, দাদু সামান্য ডানদিকে বেঁকে দাঁড়িয়ে তেরছা চোখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। 

মোট কথা, তাঁকে সাধক বলে সন্দেহ কেউ করবে না। আর যারা তাঁকে ফোটোর বাইরে চিনত তারা তো নয়ই। রেলের চাকরি নিয়ে এদেশে আসার আগে দাদু যাত্রাদলে বাঁশি বাজাতেন, ছেলেমেয়ের বাবা হওয়ার পরও সিনেমার পাতা খুঁটিয়ে পড়তেন। দাদু তাঁর চারের মধ্যে তিন ছেলের থেকে প্রায় এক ফুট করে বেঁটে ছিলেন। সে জন্যই বোধহয় মেজাজটাকে তিনি সর্বদাই টঙে বেঁধে রাখতেন। দিনে অন্তত একবার করে সবাইকে স্মরণ করাতেন, এটা তাঁর বাড়ি, তাঁর সংসার। তাঁর সংসার চালানোর সিস্টেম কারও পছন্দ না হলে সদর দরজা খোলাই আছে, বেরিয়ে গিয়ে নিজের সংসার বানিয়ে নিজের সিস্টেমে চালাও।

সেদিন লুচি খাচ্ছি বসে বসে। আমি তক্তপোশে, জামাই বলে মা অর্চিষ্মানকে সেই চেয়ারটায় বসিয়েছেন। তরকারি শেষ, হাফ লুচি বাঁচিয়ে রেখেছি, লাস্টে পায়েস দিয়ে খাব। এমন সময় অর্চিষ্মান বলল, “তোমার দাদুর ছবিটা দেখলে ঘনাদার কথা মনে পড়ে কিন্তু।”

ঘনাদা? আমার দাদু? রাগই হল একটু। মাথাটাথা খারাপ নাকি? অন্ধও দাদুকে ঘনাদার সঙ্গে গোলাবে না। 

অর্চিষ্মান বলল, "আহা, সে হয়তো সামনাসামনি অন্যরকম দেখতে ছিলেন, আমি বলছি এই ছবিটার কথা।" 

তারপর ও ধরে ধরে দেখিয়ে দিল। দাদুর খাড়া নাক, চওড়া কপাল, আর কপালের ওপর কালো চুলের সিঙাড়া। বিশেষ করে ওই সিঙাড়াটা। ঘনাদা ঘনাদা একটা ছাপ আছে বটে। মেনে নিলাম আমি।  

কে জানে হয়তো দাদুর মুখে সাধকের ভাবও থাকতে পারে, আমাদের বাসি চোখে ধরা পড়ে না।


April 13, 2017

A Table of One's Own



স্টিফেন কিং-এর ‘অন রাইটিং’-এ একটা টেবিলের কথা আছে। লন্ডনের এক ঝাঁ চকচকে হোটেলের একটি প্রকাণ্ড রাজকীয় টেবিল। সিঁড়ির মাথায় কিংবা লবিতে কোথায় যেন সেটা রাখা ছিল। এমন কোথাও যা লোকের চোখে পড়বে। (সবটাই স্মৃতি থেকে লিখছি। উঠে গিয়ে বুককেস থেকে বই পেড়ে আনতে পারি। কিন্তু আড়াইশো পাতার বইয়ে কন্ট্রোল এফ ছাড়া “টেবিল” কে খুঁজবে? কাজেই শহর মানুষ ইত্যাদি বিশেষ্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মূল ভাবটার হবে না, প্রমিস।)

কিং-এরও চোখ পড়ল। হোটেলের কর্তৃপক্ষ তাঁকে গর্বিত মুখে জানালেন, এই টেবিলটা একজন লেজেন্ডারি লেখকের। হোটেলবাসের এক রাতে কিং-এর ভয়ানক লেখা পেল, উঠে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কাগজ পেন পাওয়া যাবে? বেয়ারারা দৌড়ে এনে দিল। কিং জিজ্ঞাসা করলেন এই টেবিলে বসে লেখা যাবে? ম্যানেজার দৌড়ে এসে ঘেরাটোপ সরিয়ে জায়গা করে দিল। টেবিলে বসে স্টিফেন কিং ফসফস করে লিখে ফেললেন ষোলো পাতা। লং হ্যান্ড। এমনিতে কিন্তু কিং লং হ্যান্ড লেখেন না। আমি জানি, ওঁর লেখা নিয়ে আরেকটা লেখায় আমি পড়েছি। কিং লং হ্যান্ড লিখতে পছন্দ করেন, কিন্তু মাথা যে বেগে চলে, পেন সে বেগে চলে না, সে এক ভজঘট ব্যাপার হয়। মাথার সঙ্গে পাল্লা দিতে কি-বোর্ড বেটার।

অ্যাটোনমেন্ট-এর লেখক ইয়ান ম্যাকুয়ান-এর বলছিলেন একবার, লেখার জন্য একটা টেবিল বানিয়েছেন তিনি নিজের জন্য। প্রায় বারো ফুট লম্বা। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ে ঠাসা ঘরে, বিরাট বিরাট জানালার সামনে সে টেবিল রাখা থাকে। টেবিলে থাকে শুধু একটি বৃহৎস্ক্রিন অ্যাপেল কম্পিউটার। বাকি জায়গায় বই, খাতা, নোটস। রোজ সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ ফোন, ইন্টারনেট, ইমেল বন্ধ করে এই টেবিলে এসে বসেন ম্যাকুয়ান। আইডিয়া থাক না থাক, লেখার ইচ্ছে থাক না থাক। তারপর টেবিল বুঝবে সে লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেবে কি না।

টেবিলের মহিমায় আমিও বিশ্বাস করি। অফিসে আমার যেটুকু কাজ হয়, আমার টেবিলের কল্যাণেই হয় বলে আমার বিশ্বাস। কত লোককে দেখি ঝটাক ঝটাক টেবিল বদল করছে, ভালো থেকে আরও ভালো, পছন্দসই থেকে আরও পছন্দসই। আমাকে বলে, অনেকদিন তো হল এই ডেস্ক, বদলাতে চাও না? আমি বলি, ভালোই তো আছে। প্রথম যখন এসেছিলাম, কী দুঃখই না হয়েছিল। সবক’টা খুঁত চোখে বাণের মতো বিঁধেছিল। ড্রয়ার আছে, কিন্তু একটু জোরে না ঠেললে পুরোটা বন্ধ হয় না। সামনের বোর্ডে কে সেলোটেপ দিয়ে কী বাণী সেঁটেছিল, টেনে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ডেস্কের লাল রঙের খানিকটা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। প্রথম ক’মাস যতবার চেয়ারে বসতাম, ওই চটারং চোখে পড়ত। এখন আর পড়ে না। এখন চোখে পড়ে আমার শখ করে কেনা বাহারি জলের বোতল, আমার বাড়ির ডাবর হানির বোতল বেয়ে ওঠা মানি প্ল্যান্ট, চটা রং বোর্ডে সারা বছরের ছুটির হিসেব, আর তার পাশে আমার নিজস্ব পছন্দের বাণী। 

ডান ইজ বেটার দ্যান পারফেক্ট।

*****

আমাদের বাড়িতেও আছে একখানা টেবিল। টেবিলের ওপর খবরের কাগজ, খবরের কাগজের বিল, গল্পের বই, গ্যাসের রসিদ, ওষুধের পাতা, ব্যাংকের পাসবই, খুচরো। বাল্মীকিপ্রতিভার মেক আপ নেওয়া রবীন্দ্রনাথের ছবির নিচে ওঁরই হাতের লেখায় “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য…” ছাপা পিচবোর্ড। দু'খানা (কখনও কখনও তিনটে) ল্যাপটপ।গুচ্ছের রিফিলসহ এবং রিফিলছাড়া ডটপেন পেনসিলপোরা ফ্যাবইন্ডিয়ার কাপ, যার মধ্যে নেল কাটার আর ছোট কাঁচিটাও থাকার কথা। ডান হাঁটুর পাশের ওপরের ড্রয়ারে থার্মোমিটার থেকে শুরু করে তেলের বোতলে ছ্যাঁদা করার স্ক্রু ড্রাইভারের মতো দেখতে একটা যন্ত্র, ইউনিভার্সাল অ্যাডাপটর, ব্যাটারির পাতা, আর  অদ্ভুত ভাবে একখানা স্ট্যাম্পের কালি প্যাড। আমার না, অর্চিষ্মানেরও নাকি না।  

ওই টেবিলে বসেই আমি অবান্তর লিখি।  

শুনে মনে হতে পারে আমাকে বেঁধেমেরে লেখানো হয়, তেমন নয়। ওই টেবিলে লেখার অনেকগুলো সুবিধে আছে। অর্চিষ্মান ও ঘরেই থাকে সর্বক্ষণ। এ পাশে আরেকটা ঘর আছে, কিন্তু সেটা দুয়োরানী ঘর। সে ঘরের চেয়ারে আমরা রোজকার পরার জামা ডাঁই করে রাখি। খবর না দিয়ে লোক এলে ভালো ঘরটার আবর্জনা এ ঘরে ছুঁড়ে ফেলে মাঝের পর্দা টেনে দিই। তাছাড়া এ ঘরে টেবিল নেই। লিখতে হলে লিখতে হবে খাটে বসে। আর খাটে বসে লিখতে গেলে একটু পরেই কেতরে শুয়ে পড়ার সম্ভাবনা। টেবিল থেকে নেমে গিয়েও খাটে শুয়ে পড়া যায়, কিন্তু তাতে কয়েকটা স্টেপ বেশি লাগে বলে বিবেক কামড় দেওয়ার সময়ও বেশি পায়। 

তাছাড়াও এ ঘরে লোক থাকে না বলে ঘরটা সবসময় ঠাণ্ডা মেরে থাকে কেমন। কেমন ছায়াছায়া, মনমরা, স্যাতসেঁতে। একদিক থেকে দেখতে গেলে কাজের কাজ করার জন্য এই ঘরটাই আদর্শ। তবু আমার এ ঘরে মন বসে না। 

সাঁইত্রিশ হতে চলল, এখন মন না বসলে আর বসিয়ে কাজ নেই ভেবেচিন্তে আমি এ ঘরের জন্য একটা টেবিলচেয়ারের অর্ডার দিয়েই ফেললাম। শান্তি এসেছিলেন রবিবার সকালবেলা মাপ নিতে। উনি দেওয়ালের গায়ে ফিতে ঠেকাচ্ছেন আর আমি বলছি, “কমান কমান। আরও ছোট করুন। এ টেবিলে থাকবে খালি আমার ল্যাপটপ আর ছোট ডায়রিখানা। ব্যস।” শান্তি বললেন, “ফাইলটাইল? ফোল্ডারটোল্ডার?” আমি বললাম, “কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। ইচ্ছে হলেও যাতে না রাখতে পারি এমন করে বানান।” নিচে একখান ড্রয়ার? বিলকুল না। ড্রয়ার এমনিতেই দরকারের বেশি হয়ে গেছে বাড়িতে। শান্তি শেষমেশ বললেন, “একখান জলের বোতল রাখারও জায়গা না হলে কিন্তু প্র্যাকটিকাল হবে না দিদি…” আমি ভেবে দেখলাম জলের বোতল জরুরি, জলের বোতল না হলেও চায়ের কাপ তো রাখতেই হবে। ঠিক আছে, জলের বোতল অ্যালাউ করা যেতে পারে। কিন্তু তার বেশি কিচ্ছুটি নয়। শান্তি মাপ নিয়ে চলে গেলেন। আপাতত উনি গেছেন কলকাতা, মেয়েকে নিয়ে ফিরবেন সামনের সপ্তাহে। আমার ইমপ্র্যাকটিক্যাল টেবিল তৈরি হয়ে চলে আসবে তার পরের সপ্তাহেই।

আমার টেবিল। 

শব্দদুটো সেই থেকে বুকের ভেতর বার বার ধাক্কা মারছে আর একটা অসামান্য ফুর্তি ছেয়ে ফেলছে আমার সারা শরীরমনমাথা। অপরাধবোধ হল। লোকে যে বলে একসন্তানরা স্বার্থপর হয়, কথাটা ভুল নয় তবে। অর্চিষ্মান কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্ক্রিনের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিল, গিয়ে একদিকের কান থেকে ফোনটা সরিয়ে বললাম, “তুমি গিয়ে মাঝে মাঝে বোসো ওই টেবিলে, কেমন?” অর্চিষ্মান চোখ ঘুরিয়ে বলল, “বোঝা গেছে।”

*****

যে পোস্টের শুরু কিং-এর টেবিলের গল্প দিয়ে, তাকে কুন্তলার টেবিলের গল্প দিয়ে শেষ করা ভালো দেখায় না। লন্ডনের সেই দামি হোটেলের সংরক্ষিত নক্ষত্রের ছোঁয়া লাগা টেবিলে এক রাত লিখে এমন মোহিত হয়ে গেলেন কিং যে স্থির করলেন তাঁরও ও রকম একখানা টেবিল চাই। সে টেবিলে শুধু কিং লিখবেন। সংসারের আর কোনও কাজে তাকে ময়লা করা হবে না। বাড়ি ফিরেই টেবিলের অর্ডার দেওয়া হল। মহার্ঘ কাঠের, বিস্তীর্ণ টেবিল। যখনতখন লোকে যাতায়াত করে না এমন একখানা ঘর বেছে তাকে স্থাপন করা হল। তার দিকে তাকিয়ে, তার গা থেকে বিচ্ছুরিত মেহগনি আভা দেখে কিং-এর গা ছমছম করতে লাগল। সাহস সঞ্চয় করে টেবিলে বসলেন স্টিফেন কিং। মসৃণ টেবিলটপ তাঁর সামনে ম্যানিকিওরড মাঠের মতো বিস্তৃত হয়ে রইল। কম্পিউটার এল, খাতা এল, বই এল, কি-বোর্ডের ওপর আঙুল উদ্যত হল। লেখা এল না। 

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কিং আবার নিজের পুরোনো টেবিলে ফিরে গেছেন, যেটা বাড়ির মাঝখানের একটা ঘরের কোণায় রাখা। এদিকে একটা এক্সট্রা বই গুঁজতে গেলে ওদিকের একটা বই মাটিতে পড়ে যায়। সে ঘরের মধ্য দিয়ে সকলেই চলাচল করে, চেঁচিয়ে একে অপরকে ডাকে। কিং অত্যন্ত বিরক্ত হন, কিন্তু লেখা মহানন্দে স্রোতের মতো বইতে থাকে।

আমারও যদি এরকম হয়? একলা ঘরে একলা টেবিলে বসে লেখার বদলে যদি হাঁ করে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে টিকটিকির চলাচল দেখতে হয়? সম্ভাবনাটা আমার মাথায় আসেনি তা নয়। সমাধানও এসেছে। যদি ও ঘরে বসে লেখা না বেরোয় তাহলে টেবিলসুদ্ধু আমি আবার এ ঘরে হাজির হব। ওই জন্যই অত ছোট করে বানাতে বলেছি। যাতে আমি আর আমার টেবিল ফিট করে যাই।


April 10, 2017

পাড়াপড়শি



কোথায় থাক-র উত্তরের একটা চেনা প্রত্যুত্তর আছে। সেটা হচ্ছে আমি যেখানে থাকি তার আশেপাশের প্রশ্নকর্তার চেনা কেউ একজন থাকে, তাঁকে আমি চিনি কি না। “আশপাশ”-এর পরিধি জায়গা ভেদে বদলে যায়। নাকতলার আশপাশ ৮বি থেকে টালিগঞ্জ। রিষড়ার ক্ষেত্রে সেটা হয়ে যায় লিলুয়া থেকে তারকেশ্বর। 

"ভদ্রেশ্বরে আমার পিসতুতো মামি থাকেন, চেনেন?"  

"আচ্ছা, শ্রীরামপুরে মামাতো পিসি?" 

কাঁহাতক আর লোককে হতাশ করা যায়। আমি পাড়ার নাম শুনে খানিকক্ষণ কপাল কুঁচকে থাকি, উনিশশো নিরানব্বইয়ে একবার গেছিলাম বটে ওই পাড়ায়। "কী রকম দেখতে বলুন তো আপনার পিসি? রসগোল্লার মতো মুখ, বাতাসার মতো টিপ?"  

"বাতাসা টিপ মিলে গেছে, মুখটা খালি রসগোল্লার বদলে লর্ড চমচম। মনে পড়ছে?"

আমি সেকেন্ডখানেক সময় নিয়ে চোখ বিস্ফারিত করি, "হ্যাঁ হ্যাঁ, পড়ছে পড়ছে। তিন নম্বর বাসে করে যেতেন আসতেন তো? ওঁকে তো দেখেছি কতবার।" 

খুশি হয়ে সামনের লোক চলে যান। আজ রাতে নির্ঘাত পিসির বাড়ি ফোন যাবে। "তোমাদের ওদিকের একজন, রিষড়ায় থাকে, মাশরুমের মতো নাক আর ছাগলের মতো চোখ। চেন নাকি?"

একমাত্র সি আর পার্কের ক্ষেত্রে দেখেছি পরিধিটা সি আর পার্কেই সীমাবদ্ধ থাকে। কেউ আমাকে কখনও সি আর পার্কে থাকি শুনে ময়ূরবিহারের বাঙালি কিংবা গাজিয়াবাদের বাঙালিকে চিনি কিনা জানতে চাননি। তবে ডি ব্লকে থাকি অথচ সি কিংবা ই ব্লকের লোককে চিনি না শুনলে অনেকেই আহত হয়। আমি তড়িঘড়ি বলি, "আসলে আমরা ভাড়া থাকি তো, বছর বছর পাড়া বদলে যায়, তাই কাউকে চেনা হয়ে ওঠে না।"

না চেনা নিয়ে আমার আফসোসই আছে। এক জায়গায় থাকলে, এক বাজারে বাজার করলে, এক ফুচকাওয়ালার থেকে ফুচকা খেলে, এক রসরাজ থেকে মিষ্টি কিনলে একে অপরকে চেনাই উচিত, অন্তত আমার তাই মত। অর্চিষ্মান শহুরে লোক, ওর এ সব না চেনায় কোনও অপরাধবোধ নেই। অত চেনাচিনির কী আছে। পাশ দিয়ে গেলে ফোন চেক করার ভঙ্গি করবে, নেহাত চোখে চোখ পড়ে গেলে কাষ্ঠ হাসবে, ব্যস। 

রিষড়ার বাড়িতে একদিন সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে আমগাহের মুকুল পরীক্ষা করার সময় সামনের বাড়ির একজনকে উল্টোদিকের বাড়িকে উদ্দেশ্য করে “আজ বিছানা কে তুলল, কর্তা না গিন্নি?” চেঁচাতে শুনে অর্চিষ্মান যত অবাক হয়েছিল, তত আর কিছুতে নয়।

কিন্তু পরিস্থতি সামান্য হলেও বদলাচ্ছে। এক পাড়ায় প্রায় সাড়ে তিন বছর কাটানোর পর আমি আমার প্রতিবেশীদের অল্প অল্প চিনতে শুরু করেছি। বেশিরভাগেরই সঙ্গে আলাপ চৌখিক, কারও কারও সঙ্গে কিঞ্চিৎ বেশি। এঁদের একজন থাকেন মোড়ের মাথার, যেখানে পাশাপাশি দাঁড়ানো একটা তুলো গাছ আর একটা ছাতিম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক বিকেল হলেই মোটা ছুঁচে বিঁধিয়ে রজনীগন্ধার মালা গাঁথেন, চারতলা বাড়িটার দোতলায়। বারান্দায় একগাদা টব আর গাছ আর একটা হেলানো চেয়ার, চেয়ারের ওপর ছড়ানো একগাদা পেপারটেপার খেয়াল করেছিলাম আমি আগেই, একদিন দু’হাতে ভারি বোঝা নিয়ে ফিরছি, এমন সময় ওপর থেকে ঘোঁক করে একটা শব্দ এল। সংক্ষিপ্ত এবং গম্ভীর। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি ঘৃতকুমারীর ঝাড়ের ফাঁক থেকে উঁকি মারছে একটি প্রাজ্ঞ মুখ। বাদামি রঙের ছোটখাটো শরীরের আগায় গোল মুণ্ডুতে গোলতর চোখ, ভুরু সর্বক্ষণ কোঁচকানো, ঠোঁটে সর্বদা বিরক্তি। আমি মুখ তুলে, মুখ নামিয়ে, এদিকওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আমাকে কিছু বলছেন দাদা?" আরেকবার ঘোঁক শব্দ হল। এবার বিরক্তির মাত্রাটা বেশি। "আশেপাশে আর কি কেউ আছে, যে তাকে ডাকব? আর দেখে কি মনে হচ্ছে আমি অকারণে ডাকাডাকি করার লোক?" 

মোটেই নয়। পাগ আমাকে তারপরেও অনেকবার ডেকেছে। একদিন ঝালমুড়ি খেতে খেতে আসছিলাম, বারান্দা থেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, "কী খাচ্ছিস?" নিরামিষ মুড়ি তাও আবার ঠেসে লংকা দেওয়া শুনে ছ্যাৎরানো মুখ আরও ছেতরে চলে গেল বারান্দার ওদিকে।

প্রতিবেশী বটে, কিন্তু পাগকে আমি রীতিমতো সমীহ করে চলি। আমি নিশ্চিত পাগ গ্রাফিক নভেল ছাড়া আর কিছু পড়েন না, তাও শুধু ইংরিজিতে হলেই।

স্যার জেমস-এর সঙ্গে আমার দেখা হয় সাধারণত সফল-এর দোকানে। আমি ঝুড়ি নিয়ে আলুপটল টমেটো কুড়োই। মা বলেন গোল টমেটো পোড়াতে ভালো। গোল টমেটো আজকাল আর পাওয়া যায় না, সব শক্ত, ছুঁচোলো। আমি টমেটো টিপে টিপে পরীক্ষা করি, স্যার জেমসের বকলস লাগোয়া পার্কের রেলিং-এ বাঁধা থাকেন। আমি মাঝেমাঝে আই কন্ট্যাক্টের চেষ্টা করেছি, বিশেষ সুবিধে হয়নি। একদিন ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে চোখে চোখ পড়েই গেল আর তখন এক বিরাট হাই তুলে নিজের ধারালো দাঁত বিকশিত করেই মুখ ফিরিয়ে স্যার জেমস আবার নিজের কাজে মন দিলেন। কাজ বলতে পাশ দিয়ে একটা নেড়ি যাচ্ছিল তাকে দেখে একবার ঘ্যাঁক করে নিজের আপত্তি জানান দেওয়া। 

এত দেমাক কীসের, সত্যি বলছি, ভেবে পেতাম না। তারপর রহস্য উদ্ঘাটন হল। যিনি স্যার জেমসকে পার্কের রেলিং-এ বেঁধে সফল-এ ঢোকেন তাঁকে দেখে। তিনি কুমড়ো/সিতাফলকে পাম্পকিন বলেন, ঢ্যাঁড়স/ভিন্ডিকে বিন্ডি, গোবি গোওবি হয়ে যায় অসতর্ক হলেই। বুঝলাম স্যার জেমস বহুদিন বিদেশে থেকে ফিরেছেন। আমার মতো নেটিভের সঙ্গে মেশার উৎসাহ নেই। মনের দুঃখ খানিকটা কমল। স্যার জেমস নামটাও তখনই স্থির করলাম। 

দেমাক অবশ্য যে কেবল বিদেশে গেলেই হতে হবে তেমন নয়। বা স্যার জেমসের মতো দশাসই হলেই নয়। দেমাকের ক্ষেত্রে সাইজ ডাজ নট ম্যাটার। আমাদের বাড়ির পেছনের গলিতে একজন প্রতিবেশী থাকেন, দেমাকে যিনি স্যার জেমসের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন, অথচ সাইজের দিক থেকে স্যার জেমসের দশ ভাগের এক ভাগ। ইন ফ্যাক্ট, দূর থেকে তিনি যখন তাঁর মানুষের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে আসেন অনেক সময় তাঁকে দেখাই যায় না, খালি মনে হয় মাটির ওপর কুচকুচে কালো রঙের একটা কম্পমান বল চলেছে। কাছে এলে বলটার নিচে চারটে পা দেখা যায় আর একেবারে ঘাড়ের কাছে এলে স্পষ্ট হয় বলের সামনে একটা গোল মুখ, ঝুপো লোমের মধ্যে থেকে গোল গোল কাচের গুলির মতো একজোড়া চোখ। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এঁর দেমাক চেহারার। ধরাকে সরা এবং আমাকে মাছি জ্ঞান করেন।

আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। সকাল বিকেল আমাদের গলি পেরিয়ে আসেন যান। কেউ কেউ খেয়ে খেয়ে এত মোটা হয়েছেন যে জানুয়ারির শীতেও এক হাত লম্বা জিভ বার না করে হাঁটতে পারেন না। কেউ ভয়ানক ফিট, সঙ্গের মানুষকে ছুটিয়ে সারা করেন। কেউ বুড়োবুড়ির বাড়িতে থাকেন, বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই, সারা বিকেল গ্রিলের দরজায় নাক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আশপাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা বেড়াতে বেরোলে কথোপকথন চালান। বা চালানোর চেষ্টা করেন। কারণ যাদের সঙ্গে ইনি কথা বলেন তারা বেশিরভাগ সময়েই উত্তর দেয় না, ল্যাজ নাড়তে নাড়তে নাক আকাশে তুলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। এঁর সব কথা যে বুঝি তা নয়, তবে শুনে মনে হয় কথাগুলো বিশেষ মোলায়েম নয়। সারাদিন বন্দী থেকে থেকে বেচারার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। 

আরও অনেকে আছেন, যারা রাস্তায় কিংবা বাজারে থাকেন, মনুষ্যসঙ্গের ধার ধারেন না। বাজারের ঠিক মাঝখানটায় কাত হয়ে শুয়ে থাকেন চার পা যতখানি সম্ভব ছড়িয়ে, বাকিরা কোথা দিয়ে হাঁটবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র কনসিডার না করেই। আমি মাঝে মাঝে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, ভাবি, ঘুমন্ত যখন অভদ্রতা হবে না নিশ্চয়। কাছে যাওয়া মাত্র ভুল ভাঙে। লোক গেলে পা সরাচ্ছেন না, কিন্তু চোখ খুলে রেখেছেন অল্প করে। আমি যে ওঁকে দেখছি, সেটা উনিও দেখে রাখছেন।

পাড়াপড়শির খবরাখবর না রাখাজনিত যে গ্লানিটা আমার ছিল সেটা খুব ধীরে হলেও কাটতে শুরু করেছে। সি আর পার্কে আপনার  চেনাজানা দুপেয়ে কেউ যদি থেকে থাকেন তাহলে খুব সম্ভবত আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু সেই দু’পেয়ের চারপেয়ে যদি কোনও সঙ্গী থাকে তাহলে খুব সম্ভব আমি সেই চারপেয়েকে চিনি।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.